ভারতে একজন মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় প্রায় ২.৩৩ লক্ষ টাকা। অথচ নতুন আইফোন ১৮ প্রো-র দাম শুরুই হচ্ছে ১,৬৪,৯০০ টাকা থেকে। আর অ্যাপলের নতুন ফোল্ডিং ফোন আইফোন ডুও-র দাম ৪,৪৯,৯০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ, গড় ভারতীয়ের এক বছরের আয়ের কাছাকাছি টাকা দিয়েও এই ফোন কেনা সম্ভব নয়। তবু ভারতে অ্যাপলের ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। রহস্যটা কোথায়?
2
10
আসলে অ্যাপল ভারতের ১৪০ কোটির বেশি মানুষকে একসঙ্গে টার্গেট করে না। দেশের ক্রেতাদের আয় ও খরচের ক্ষমতায় বড় ফারাক রয়েছে। একদিকে রয়েছে উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের একটি অংশ, অন্যদিকে রয়েছে উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের বিশাল অংশ। অ্যাপলের নজর মূলত সেই সচ্ছল অংশটির উপরেই, যাদের কেনাকাটার ক্ষমতা দেশের গড় আয়ের থেকে অনেকটাই বেশি।
3
10
ধরা যাক, ভারতের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ আইফোন কেনার ক্ষমতা রাখেন। সেক্ষেত্রে সংখ্যাটা দাঁড়ায় প্রায় ৭ কোটি। এই একটি অংশই অ্যাপল-এর জন্য বিশাল বাজার। এই সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা ব্রিটেন, ফ্রান্স বা ইতালির মতো দেশের মোট জনসংখ্যার থেকেও বেশি। অর্থাৎ, শতাংশে ছোট হলেও সংখ্যায় ভারতের ধনী ক্রেতার বাজার বিশাল।
4
10
ভারতের ভোক্তা বাজারকে কার্যত তিন ভাগে দেখা হয়ে থাকে। একেবারে সচ্ছল অংশের জীবনযাত্রা ও খরচের ধরন উন্নত দেশের ক্রেতাদের কাছাকাছি। দ্বিতীয় অংশটি উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্রেতা। আর সবচেয়ে বড় অংশের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। জাতীয় মাথাপিছু আয় এই তিন অংশকে একসঙ্গে গড় করে। কিন্তু অ্যাপল-এর ব্যবসার হিসাব সেই গড় দিয়ে হয় না।
5
10
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের আইফোন বিক্রি বাড়ছে মানেই দেশের গড় মানুষ অনেক বেশি ধনী হয়ে গিয়েছেন এমনটা নয়। বরং দেশের তুলনামূলক ছোট কিন্তু অত্যন্ত সচ্ছল একটি ক্রেতা গোষ্ঠী সংখ্যায় এতটাই বড় যে সেটিই অ্যাপলের জন্য আলাদা একটি বাজার তৈরি করেছে।
6
10
ভারতের স্মার্টফোন বাজারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে স্মার্টফোন বিক্রির পরিমাণ মাত্র ১ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু বাজারের মোট মূল্য বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, মানুষ শুধু বেশি ফোন কিনছেন না, কিন্তু অনেকে আরও দামি ফোনের দিকে ঝুঁকছেন। একই সময়ে ভারতে অ্যাপলের ফোন সরবরাহ প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে এবং কোম্পানিটি স্মার্টফোনের বাজারের প্রায় ২৮ শতাংশ দখল করে ফেলেছে।
7
10
১,৬৪,৯০০ টাকা একবারে খরচ করা অনেকের কাছেই কঠিন। কিন্তু সেই দাম যদি মাসিক কিস্তিতে ভাগ হয়ে যায়, তখন মানসিক হিসাবটা বদলে যায়। ক্রেডিট কার্ড, ঋণ ও ইএমআইয়ের মাধ্যমে দামি ফোনও অনেক ক্রেতার নাগালের মধ্যে চলে আসে। এনডিটিভি-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৩৫ শতাংশ স্মার্টফোন কেনাকাটা কোনও না কোনও ধরনের ইএমআইয়ের মাধ্যমে হয়েছে। ২০২৬ সালে তা ৪২ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে অনুমান।
8
10
ভারতে আইফোন-এর গুরুত্ব শুধু ক্যামেরা, প্রসেসর বা প্রযুক্তির মধ্যে আটকে নেই। অনেকের কাছে এটি এখন প্রযুক্তি + জীবনযাপন + উচ্চাকাঙ্ক্ষা + সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। ফলে দাম বেশি হলেও একটি নির্দিষ্ট ক্রেতাগোষ্ঠীর কাছে আইফোন কেনার ইচ্ছা কমছে না। বরং কিস্তির সুবিধা সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে পরিণত করছে।
9
10
দামি স্মার্টফোনের বাজার এখন আর শুধু মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু বা কলকাতার মতো বড় শহরে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অফলাইন স্মার্টফোন বাজারে প্রিমিয়াম ফোনের অংশ ২০২২ সালের ১০ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ছোট ও মাঝারি শহরের ক্রেতাদের মধ্যেও দামি ফোনের চাহিদা বাড়ছে।
10
10
এখানেই অ্যাপলের আসল ব্যবসায়িক কৌশল। কোম্পানিকে ভারতের প্রত্যেক মানুষের কাছে আইফোন বিক্রি করতে হবে না। যদি কয়েক কোটি সচ্ছল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্রেতাই নিয়মিত প্রিমিয়াম ফোন কেনেন, তাহলেই বাজার যথেষ্ট বড়।