মিছিলের সামনের সারিতে ফেস্টুন হাতে একঝাঁক তরতাজা মুখ, পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার মরিয়া জেদ আর সমাজমাধ্যমে ঝাঁঝালো স্লোগান—বাইরে থেকে দেখলে মনে হতেই পারে আলিমুদ্দিনের উঠোনে হয়তো নতুন রক্ত সঞ্চালনের জোয়ার এসেছে। কিন্তু পথসভার হাততালি আর বাস্তবের দলীয় খাতায় নামের সংখ্যার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা এবার কোনো বিরোধীর খোঁচায় নয়, চরম অস্বস্তির সঙ্গে কবুল করতে হলো খোদ রাজ্য সিপিএম নেতৃত্বকেই।
2
9
২০২৫ সালের সদস্যপদ পুনর্নবীকরণ প্রক্রিয়ার যে পরিসংখ্যান দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে , তা যেকোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সতর্কবার্তা, বিশেষ করে যখন দাবি করা হচ্ছিল যে তরুণ প্রজন্ম আবারও লাল পতাকার দিকে ঝুঁকছে। কার্যত স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, রাজপথের ক্ষোভকে সংগঠনের খাঁচায় বন্দি করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ কমরেডরা।
3
9
রাজ্যের সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতে শত শত ছাত্র-যুব ময়দানে নামলেও দলের সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ তো দূরস্ত, সামগ্রিক সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির বদলে উল্টে সামান্য কমে গিয়েছে। সবচেয়ে করুণ ছবি ধরা পড়েছে তৃণমূল স্তরের শাখা সংগঠনগুলিতে।
4
9
যে শাখাকে লেনিনীয় পার্টির মেরুদণ্ড বলা হয়, সেই স্তরে ৬০ শতাংশেরও বেশি শাখায় কোনও সহকারী কর্মী বা ‘এজি’ সদস্য নেই। অর্ধেক আকাশ জয়ের বুলি আউড়ানো দলের বহু শাখায় একজনও মহিলা সদস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। আর যে তারুণ্য নিয়ে নেতৃত্বের বাগাড়ম্বর শেষ হয় না, সেই ৩০ বছরের কম বয়সিদের অনুপাত গোটা রাজ্যে এখনও আশঙ্কাজনকভাবে তলানিতে।
5
9
আন্দোলনের উত্তাপ নিভে গেলে সেই তরতাজা মুখগুলোকে ধাপে ধাপে দলীয় ডিসিপ্লিন ও ক্যাডার কাঠামোর মধ্যে টেনে আনার মতো রাজনৈতিক মুন্সিয়ানার চরম ঘাটতি যে নেতৃত্বের রয়েছে, তা আর ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে না।
6
9
তফশিলি জাতি, উপজাতি, অনগ্রসর শ্রেণি কিংবা সংখ্যালঘুদের পার্টির ভেতরে এনে দায়িত্বশীল নেতৃত্বে বসানোর ফাঁকা বুলি বারবার আউড়ানো হলেও মাটিতে যে কোনও পরিকল্পিত পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি, তা-ও পার্টির দলিলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে চরম অসহায়তার সঙ্গে। যদিও এই প্রসঙ্গে রাজ্য কমিটির এক সদস্য জানান, চরম দক্ষিণপন্থার উত্থানের সময় সহজেই বিপথে পরিচালিত করার হাজারটা উপাদান সবসময় ঝুলিয়ে রাখে সমাজের সামনে। এই পরিস্থিতিতে 'সঠিক' পথে নিয়ে আসাটাও একটা কঠিন 'চ্যালেঞ্জ'.
7
9
বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না হওয়া স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, নীচুতলার সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের যোগসূত্র কতটা আলগা। আরএসএস বা বিজেপির মতো সুসংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক হিন্দুত্ববাদী শক্তি যখন বাংলার প্রত্যন্ত কোণে শেকড় চারিয়ে দিচ্ছে, তখন তার মোকাবিলায় সিপিএমের পুরোনো আমলাতান্ত্রিক ধাঁচের সাংগঠনিক চর্চা যে কতটা অচল হয়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট।
8
9
নীতিগত ভিত্তির অভাব এবং আত্মতুষ্টির রাজনীতি যে দলকে ক্রমাগত ভুলের ‘কানাগলি’তে ঠেলে দিচ্ছে, সেই উপলব্ধি হয়তো হচ্ছে, কিন্তু কল্যাণীতে রাজ্য কমিটির বর্ধিত অধিবেশনে শুধুই সতর্কবার্তা আর নীতিবাক্য বিলিয়ে সেই জমাট বাঁধা জড়তা কতটা ভাঙা সম্ভব, তা নিয়ে দলের অন্দরেই গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
9
9
রাস্তায় হাঁটা আর পার্টি গড়ে ক্ষমতার পরিসরে ফেরা যে এক নয়, এই নির্মম সত্যিটা এখনও আলিমুদ্দিনের প্রবীণ নেতারা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছেন কি না, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।