বিশ্ব উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, তার জন্য একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি দায়ী আমেরিকা। সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার' (Nature)-এ প্রকাশিত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ১৯৯০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমেরিকার কার্বন নিঃসরণের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিরাট ধাক্কা।
2
5
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মার্শাল বার্কের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় গত তিন দশকে বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের সঙ্গে বিশ্ব জিডিপি (GDP)-র পতনের সরাসরি যোগসূত্র খোঁজা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি দূষণকারী দেশ হিসেবে আমেরিকা বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি করেছে, তা অন্য যেকোনও দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
3
5
আমেরিকার ঠিক পরেই রয়েছে চীন, যার কার্বন নিঃসরণের কারণে ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে এই ক্ষতির বণ্টন মোটেও সমান নয়। দেখা গেছে, আমেরিকার নিঃসরণের ফলে হওয়া মোট ক্ষতির মাত্র ২৫ শতাংশ তারা নিজেরা ভোগ করেছে, বাকি ৭৫ শতাংশ ক্ষতির বোঝা বইতে হয়েছে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে, যার মধ্যে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংখ্যাই বেশি।
4
5
এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। গবেষণার হিসেব অনুযায়ী, শুধুমাত্র আমেরিকার নিঃসরণের কারণে ভারত গত ৩০ বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। একইভাবে ব্রাজিলের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন ডলার। তীব্র দাবদাহ, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং কৃষিকাজে উৎপাদনশীলতা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো এই বিপুল ক্ষতির প্রধান কারণ। গবেষক মার্শাল বার্কের ভাষায়, "এই পরিস্থিতি অনেকটা হাজারটা ছোট ছোট ক্ষতের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো। ৩০ বছর ধরে এই প্রভাব জমতে জমতে আজ এই বিশাল আকার ধারণ করেছে।"
5
5
উন্নয়নশীল দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছে যে, উন্নত দেশগুলো—যারা ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি দূষণ ছড়িয়েছে—তাদের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কিন্তু আমেরিকা বরাবরই এই আইনি দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দরিদ্র দেশগুলোকে সাহায্য করার জন্য তৈরি 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' ফান্ড থেকেও তারা নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সেস মুরের মতে, এই গবেষণা প্রকৃত মানবিক সংকটের হয়তো সামান্য অংশই তুলে ধরেছে। কারণ, একজন ধনী ব্যক্তির এক ডলার হারানোর চেয়ে একজন অতি দরিদ্র মানুষের এক ডলার হারানোর প্রভাব অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী এবং যন্ত্রণাদায়ক। এই গবেষণা বিশ্বমঞ্চে উন্নত দেশগুলোর নৈতিক ও আর্থিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।