ইরানের গোপনতম ও দুর্ভেদ্য ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় যেকোনও মুহূর্তে হামলার কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি সাফ জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই ইরানের 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন'-এ আক্রমণ চালাতে পারে আমেরিকা।
2
13
তেহরান যাতে কোনওভাবেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই মার্কিন সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। সেখানে যেকোনও সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলেই যে আমেরিকা একচুলও রেয়াত করবে না, সে কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। মার্কিন গোয়েন্দারা ওই এলাকার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
3
13
সম্প্রতি ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একাধিক সামরিক ঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর বিমান হামলা চালায় আমেরিকা।
4
13
তবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন বা ফার্সি ভাষায় যাকে 'কুহ-ই কোলাং গজ লা' বলা হয়, তা মার্কিন বাহিনীর জন্য একেবারেই ভিন্ন ও কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। ইরানের ইসফাহান প্রদেশে এবং পূর্বে ক্ষতিগ্রস্ত নাতানজ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে একটি পাহাড়ের গভীরে গড়ে উঠেছে এই গোপন সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক।
5
13
এই সুবিশাল ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি সম্পর্কে ইরান আজ পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি, এমনকি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদেরও সেখানে প্রবেশের কোনও অনুমতি মেলেনি। ফলে উপগ্রহ চিত্র এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেই অনুমান করতে হচ্ছে এর গভীরতা।
6
13
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'আইএসআইএস'-এর মতে, পাহাড়ের প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিটার (প্রায় ২৬০ থেকে ৩৩০ ফুট) গভীরে অবস্থান করছে এই জটিল সুড়ঙ্গ পথগুলি। ফলে এটি ইরানের অন্যান্য চেনা পরমাণু কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি গভীর এবং প্রচলিত বিমান হামলায় এটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
7
13
গুঞ্জন রয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে আমেরিকা ও ইজরায়েলের ১২ দিনের বোমাবর্ষণের পর ইরান তাদের হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক সরঞ্জাম নাতানজ থেকে সরিয়ে এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে নিয়ে গেছে। সাংবাদিকরা এই বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, এমনটা ঘটে থাকতে পারে, তবে তাঁদের কাছে কোনও সরকারি রেকর্ড নেই।
8
13
তবে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং সমরাস্ত্র তৈরির মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলি মাটির নিচে এই একটিমাত্র সুরক্ষিত দুর্গে কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে তেহরানের। যদিও ইরানের বরাবরের দাবি, তাদের এই পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যেই পরিচালিত।
9
13
এখন প্রশ্ন উঠছে, পাহাড়ের গভীরে থাকা এই দুর্গ কীভাবে ধ্বংস করতে পারে আমেরিকা? প্রচলিত বাঙ্কার-বাস্টার বোমাগুলি মাটির গভীরে গিয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে ঠিকই, কিন্তু পিকঅ্যাক্সের ভেতরের সঠিক নকশা বা সুড়ঙ্গের বিন্যাস সম্পর্কে ওয়াশিংটনের কোনও নিখুঁত ধারণা নেই।ফলে গোটা পরিকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করা না গেলেও, প্রবেশপথগুলি ভেঙে দেওয়া, যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করা বা বিদ্যুৎ ও আনুষঙ্গিক সংযোগ নষ্ট করে দিয়ে এই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দেওয়ার কৌশল নিতে পারে পেন্টাগন।
10
13
তবে সেখানে হামলা চালালে বড় ধরনের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কাও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, বারবার ভারী কোনও আঘাত হানলে ওই এলাকায় কৃত্রিম ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি হতে পারে, যার জেরে পাহাড়ের ঢালে ব্যাপক ভূমিধস নামতে পারে।
11
13
সেখানে কোনও সক্রিয় পরমাণু চুল্লি না থাকায় চেরনোবিল বা ফুকোশিমার মতো বিকিরণ হয়তো ছড়াবে না, তবে ইউরেনিয়াম মজুত থাকলে বিস্ফোরণের ফলে বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক ধূলিকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। এছাড়া বিস্ফোরণে মাটির নিচের শিলাস্তর ভেঙে বিষাক্ত রাসায়নিক ভূগর্ভস্থ জলের স্তরে মিশে গেলে স্থানীয় পানীয় জলের উৎসও মারাত্মকভাবে দূষিত হতে পারে।
12
13
সব মিলিয়ে ট্রাম্প তাঁর পাঁচ মাসের সামরিক অভিযানের সাফল্য দাবি করে যতই দাবি করুন যে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে আটকে দেওয়া গেছে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
13
13
ট্রাম্প যদি সত্যি এই গোপন ঘাঁটিতে আঘাত হানার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন, তবে তার পরিণতি কেবল ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, গোটা অঞ্চলের পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।