শরতের ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ আর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সুর বেজে ওঠা মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে দুর্গাপূজার কাউন্টডাউন শুরু। আজকাল অবশ্য উৎসবের ঢং অনেকটাই বদলেছে; মহালয়ার আগেই শহর থেকে শহরতলির বহু বড় মণ্ডপের দ্বার খুলে যায়।
2
9
তবে জৌলুস যতই বাড়ুক, মহালয়ার আসল ধর্মীয় আবেগ ও তাৎপর্য আজও অমলিন। এই বিশেষ দিনটি একদিকে যেমন দেবীপক্ষের আগমন বার্তা ঘোষণা করে, তেমনই শাস্ত্র অনুযায়ী এটি পিতৃপক্ষের শেষ দিন—অর্থাৎ সর্বপিতৃ অমাবস্যা।
3
9
বিশ্বাস করা হয়, এ দিনই মর্ত্যলোক ছেড়ে পরলোকে ফিরে যান আমাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষরা। তাই তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় জল ও তিল নিবেদনের শেষ ও সবচেয়ে মাহাত্ম্যপূর্ণ দিন হল এটি।
4
9
প্রতি বছরের মতো এবারও মহালয়ার ভোর হতেই গঙ্গার ঘাটগুলোতে তর্পণ করতে মানুষের ঢল নামবে। অঞ্জলি ভরে পূর্বপুরুষদের স্মৃতিতে জলদান সেরে তবেই শুরু হবে ঘরের মেয়ে উমার আবাহন।
5
9
এ বছর মহালয়ার জ্যোতিষীয় তাৎপর্যও বেশ নজরকাড়া। ঠিক মহালয়ার আগের দিনই কন্যা রাশিতে শুক্রের গোচর ঘটছে, যার ফলে প্রায় ৫৯ বছর পর মহালয়ার পুণ্যলগ্নে তৈরি হচ্ছে এক অত্যন্ত বিরল ও শুভ যোগ।
6
9
কিন্তু এই যে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে জলদানের রীতি, এর শুরুটা ঠিক কোথায়? শাস্ত্র ও পৌরাণিক উপাখ্যানে এ নিয়ে একাধিক গভীর কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। রামায়ণের আখ্যান বলে, ত্রেতাযুগে লঙ্কা জয় ও সীতা উদ্ধারের উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র অসময়ে—অর্থাৎ সূর্যের দক্ষিণায়ন চলাকালীন—দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন।
7
9
সনাতন শাস্ত্রমতে দুর্গাপূজা বসন্তকালে হওয়ার কথা, কিন্তু অসময়ে করেছিলেন বলেই তা ‘অকালবোধন’। হিন্দু সংস্কৃতিতে যেকোনও শুভ বা বড় কাজের আগে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ নেওয়ার বিধান রয়েছে। শ্রীরামচন্দ্রও দেবী আরাধনার আগে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে অঞ্জলি নিবেদন করে তর্পণ করেছিলেন। লোকবিশ্বাস, সেই থেকেই শারদীয়া দুর্গাপূজার আগে মহালয়ায় তর্পণ করার এই বিশেষ রীতি চলে আসছে।
8
9
অন্যদিকে মহাভারতের পাতায় তর্পণের উৎস নিয়ে মেলে আরেক আখ্যান। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর দানবীর কর্ণের আত্মা যখন স্বর্গে পৌঁছায়, তখন তাঁকে খাবার হিসেবে কেবল সোনা, রূপা ও হিরে-জহরত পরিবেশন করা হয়। ক্ষুধার্ত কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে ইন্দ্র জানান, কর্ণ সারাজীবন মুক্তহস্তে ধনরত্ন বিলিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে কখনো জল বা অন্ন দেননি।
9
9
কর্ণ তখন বিনম্রভাবে জানান, নিজের বংশপরিচয় ও পিতৃপুরুষ সম্পর্কে তিনি আজীবন অজ্ঞ ছিলেন বলেই ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনও কাজ করেননি। এরপর ইন্দ্রের অনুমতিতে কর্ণ ১৬ দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে বিধিমতে অন্ন ও জল উৎসর্গ করেন। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই ১৬ দিনের কালপর্বই আজকের ‘পিতৃপক্ষ’, যার সমাপ্তি ঘটে মহালয়ার এই পুণ্যলগ্নে।