কোচ কিশোর ত্রিবেদী না থাকলে আজকের জশপ্রীত বুমরাহকে কি পাওয়া যেত? বর্তমানে কিশোর ত্রিবেদীর বয়স ৭৯। কিন্তু তিনি এখনও দারুণ ফিট। ফাস্ট বোলিংয়ে তিনি স্পেশালিস্ট। তাঁর হাত ধরেই তৈরি হয়েছেন সিদ্ধার্থ ত্রিবেদী। যিনি আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলেন। আরকজন বুমরাহ।
2
9
স্মৃতিরোমন্থন করে কিশোর ত্রিবেদী বলেন, ''নির্মাণ হাইস্কুলে পড়ত বুমরাহ। ১৬ বছর বয়সে আমার অ্যাকাডেমিতে এসেছিল। সেই সময়ে স্কুল ক্রিকেট খেলত। খুব একটা সিরিয়াস ছিল না। দিনকয়েক আমি ওকে দেখি। তার পরে ওকে বলেছিলাম, তুমি যদি ক্রিকেট নিয়ে সিরিয়াস হও, তাহলে নিয়মিত আসতে হবে। খেলায় সময় দিতে হবে। একদিন প্র্যাকটিস করে তিনদিন অনুপস্থিত থাকা যাবে না।''
3
9
কোচ কিশোর ত্রিবেদী আরও বলেছিলেন, ''তোমার মধ্যে প্রতিভা আছে। তুমি যদি মন দাও, তাহলে অনেকদূর যেতে পারবে।'' কিশোর ত্রিবেদী জানতেন বুমরাহর বোলিং অ্যাকশনই তাঁর অস্ত্র। ব্যতিক্রমী বোলিং অ্যাকশন দেখেও কিশোর ত্রিবেদী কিন্তু তা বদলাননি। সেদিন যদি কিশোর ত্রিবেদী বদলে দিতেন বুমরাহর বোলিং অ্যাকশন তাহলে হয়তো ভারত পেত না কিংবদন্তি এই তারকাকে।
4
9
শিষ্যকে একবার বলেছিলেন, শুধু গতি দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। ব্যাটসম্যানকে হারাতে হলে তাকে বিভ্রান্ত করতে হবে। কাটার শিখতে হবে, ইয়র্কার দিতে জানতে হবে। বলকে বুদ্ধিমান বানাতে হবে। ব্যাটসম্যানকে বানাতে হবে বোকা।
ভারতীয় ক্রিকেটে অনেকেই তখন স্বপ্নের পথ খুঁজছেন, আর সেই ছেলে তখন নিজের পথ তৈরি করছে। তাঁর অস্ত্র --আগুনে গতি আর এক বিস্ময়কর বোলিং অ্যাকশন।
5
9
সেই অ্যাকশন যেন ক্রিকেটের নিয়মে লেখা নয়, বরং কবিতার মতো জন্ম নেওয়া—ছোট রানআপ, শরীরের অদ্ভুত ভঙ্গি, তারপর কব্জির হঠাৎ এক ঝটকা। বল ছুটে যায় নিজের গতিতে।
6
9
এমন দৃশ্য আগে কেউ দেখেনি। না আহমেদাবাদের নেটে, না ভারতের মাঠে, না বিশ্বক্রিকেটের কোনও মাঠে।
ধুলোভরা সেই বিকেলগুলোতেই জন্ম নিচ্ছিল এক গল্প—যে গল্প একদিন ব্যাটসম্যানদের কাছে হবে আতঙ্ক, আর ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম। সেই গল্পের নাম— জশপ্রীত বুমরাহ।
7
9
স্কুল ছুটির পরে বাড়িতে বোলিং অনুশীলন চলত ছেলেটার। দুপুরে তার মা ঘুমিয়ে পড়লে সে চুপিচুপি বল ছুড়ত দেওয়াল আর মেঝের ঠিক সংযোগস্থলে। কারণ একমাত্র ওই জায়গায় বল পড়লে শব্দ হতো না—মা ঘুম ভেঙে উঠে পড়তেন না।
অজান্তেই সেই নীরব অনুশীলন তাকে শেখাচ্ছিল এক ভয়ঙ্কর শিল্প—ইয়র্কার। ধীরে ধীরে সেই ইয়র্কার হয়ে উঠল তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ব্যাটসম্যানের সামনে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয় ঘাতক ইয়র্কার।
8
9
আহমেদাবাদে রবিবার ফাইনাল। ওয়াংখেড়েতে জশপ্রীত বুমরাহর ওই অবিশ্বাস্য স্পেল না হলে ভারত আহমেদাবাদের টিকিট পেত কিনা সন্দেহ! ইংল্যান্ড ব্যাটারদের পা লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা ইয়র্কার, লো ফুলটস রানের গতি থামিয়ে দিল ইংরেজদের।
আহমেদাবাদের নেটে সেই ছেলেটার মুখোমুখি হওয়া মানেই ছিল আগুনের মুখোমুখি হওয়া—সমবয়সী ছেলেরা চুপচাপ থাকত, চোখে তাদের খেলা করত ভয়। অনেকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত, এ কি চাকার নাকি! বল ছোড়ে?
9
9
একদিন যাকে চাকার বলে ব্যঙ্গ করা হত, সেই ছেলেই আজ দেশনায়ক। জশপ্রীত বুমরাহ কেবল একজন বোলার নন, তিনি কখনও হয়ে ওঠেন আইকন, কখনও ক্যাপ্টেনের হাতের সেরা তাস, কখনও দেশের হৃদস্পন্দন, কখনও দেশের রত্ন। তাঁর জন্যই দেশ গেয়ে ওঠে বন্দে মাতরম।
আরও একবার বলকে কথা বলান আপনি। একদিন যেখান থেকে আপনার জন্য ধেয়ে এসেছিল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, সেখানেই আপনি লিখে যান নতুন এক রূপকথা। ব্যঙ্গবিদ্রুপের ছাই থেকে এক ফিনিক্সের উত্থান দেখুক আহমেদাবাদ।