তথ্য আর শব্দের ভিড় নয়, রাজা সেনের তথ্যচিত্র বদলে যাওয়া সময়, শিল্প সংস্কৃতির ঐতিহাসিক অন্তর্কথন
- 1
- 17
বাংলা ছবির দর্শক রাজা সেনকে হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে রাখবেন ‘দামু’, ‘আত্মীয়-স্বজন’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ কিংবা ‘ল্যাবরেটরি’র পরিচালক হিসেবে। কিন্তু তাঁর ক্যামেরার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, যেটি নিয়ে আলাদা করে কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে।
- 2
- 17
তিনি যখন তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, তখন তাঁর বিষয় কেবল একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিল না, সেই মানুষটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা সময়, একটা সংস্কৃতি এবং একটা সমাজও হয়ে উঠেছে ছবির বিষয়।
- 3
- 17
রাজা সেনের তথ্যচিত্রের তালিকায় তাই জায়গা পেয়েছেন সুচিত্রা মিত্র, তপন সিংহ, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময়ী দেবী এবং সমরেশ বসুর মতো ব্যক্তিত্ব। পাশাপাশি এসেছে কলকাতার ইতিহাস, সুন্দরবন, লোকসংস্কৃতি ‘আলকাপ’-এর মতো বিষয়ও।
- 4
- 17
সুচিত্রা মিত্র: রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীকে নিয়ে নির্মিত এই তথ্যচিত্রের জন্য রাজা সেন পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার। তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে রাজা সেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির একটি সুচিত্রা মিত্র৷ এই তথ্যচিত্র ১৯৯২ সালে নির্মিত হয় এবং ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আর্ট অ্যান্ড কালচার বিভাগে সেরা তথ্যচিত্রের সম্মান পায়।
- 5
- 17
এখানে বিষয় নির্বাচনটাই গুরুত্বপূর্ণ। সুচিত্রা মিত্রকে শুধু একজন গায়িকা হিসেবে দেখলে তাঁর শিল্পীজীবনের একটা অংশই ধরা যায়। কিন্তু রাজা সেনের তথ্যচিত্র তাঁকে বাংলা সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিসরের একজন মানুষ হিসেবে নথিবদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে। ফলে ছবিটি শুধুমাত্র একজন শিল্পীর জীবনী হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার একটি সময়ের দলিল।
- 6
- 17
তপন সিনহা: একজন পরিচালকের অন্তরাত্মার খোঁজ করেছিলেন আর একজন পরিচালক৷ 'ফিল্মমেকার ফর ফ্রিডম' নামে তথ্যচিত্রে রাজা সেন তুলে ধরেছিলেন পরিচালক তপন সিনহার সৃষ্টিশীল মনন। ছবিটি পরে বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কারও পায়।
- 7
- 17
সুচিত্রা মিত্রের ক্ষেত্রে যেমন সঙ্গীতের ইতিহাসের ভিতর দিয়ে একজন শিল্পীকে দেখা, তেমন তপন সিনহার ক্ষেত্রে সিনেমার মধ্য দিয়ে একজন সিনেমা-নির্মাতাকে দেখার শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে রাজা সেনের তথ্যচিত্রকে অন্যমাত্রা দিয়েছিল। রাজা সেনের তথ্যচিত্রে ক্যামেরা কেবল ‘বিখ্যাত মানুষ’ সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ করেনি, সৃষ্টির অন্তরাত্মাকেও ছুঁয়ে গিয়েছে৷
- 8
- 17
শম্ভু মিত্র: বাংলা নাট্যজগতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্র৷ থিয়েটারের এক যুগকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা ছিল শম্ভু মিত্রকে নিয়ে বানানো তথ্যচিত্রে৷ দুটি তথ্যচিত্র বানিয়েছিলেন৷ 'গ্লিম্পসেস অফ এ জিনিয়াস' এবং 'শম্ভু মিত্র' এই দুই তথ্যচিত্রে বাংলা থিয়েটার এবং তৎকালীন সময়, শিল্প, শিল্পীর সৃজনশীলতাকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন রাজা সেন৷ শম্ভু মিত্র নামাঙ্কিত তথ্যচিত্রটি ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টারের জন্য নির্মিত এবং প্রায় তিন ঘণ্টার ডকুমেন্টেশন হিসেবে তালিকাভুক্ত।
- 9
- 17
শম্ভু মিত্রকে ক্যামেরায় ধরে রাখা মানে শুধু একজন নাট্যব্যক্তিত্বের জীবন সংরক্ষণ নয়। বাংলা গ্রুপ থিয়েটার, অভিনয়ের ভাষা, মঞ্চভাবনা—একটি বিশাল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা। রাজা সেন নিজেও গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে এই কাজের মধ্যে তাঁর নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়েরও একটা প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়।
- 10
- 17
সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সমরেশ বসু: রাজা সেনের তথ্যচিত্রের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর সাহিত্যকেন্দ্রিক কাজ। তিনি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেন সাহিত্য আকাদেমির জন্য। পরে সমরেশ বসুকে নিয়েও কাজ করেন।
- 11
- 17
এখানেও তাঁর পছন্দের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। গান, সিনেমা, থিয়েটার, কবিতা, কথাসাহিত্য—বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনের কোনও একটি শাখায় নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি। বরং যাঁরা তাঁদের নিজস্ব ক্ষেত্রে একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাঁদের কাছে বারবার ফিরে গিয়েছেন।
- 12
- 17
রাজা সেনের তথ্যচিত্রের তালিকায় রয়েছেন সাহিত্যিক জ্যোতির্ময়ী দেবীও। একইসঙ্গে ১৯৯০ সালে পাঁচ পর্বের ‘ইতিহাসের কলকাতা’ তৈরি করেছিলেন তিনি, যেখানে শহরের নানা দিক উঠে এসেছিল। পরে সুন্দরবন, নৃতাত্ত্বিক বিষয়, কলকাতার শব্দদূষণ, কুমোরটুলির পরিবর্তন—এমন বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ও তাঁর ক্যামেরায় এসেছে।
- 13
- 17
অর্থাৎ তাঁর তথ্যচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না শুধুই ‘তারকা’। কখনও একজন শিল্পী, কখনও সাহিত্যিক, কখনও শহর, কখনও লোকসংস্কৃতি—বিষয় বদলেছে, কিন্তু একটি জায়গায় তাঁর কাজের মিল রয়েছে: হারিয়ে যাওয়া সময়কে শৈল্পিক এবং তথ্যনিষ্ঠ দৃষ্টিতে সংরক্ষণ করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা৷
- 14
- 17
‘আলকাপ’: তারকাবিহীন অথচ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই তথ্যচিত্র৷ রাজা সেনের 'আলকাপ এ ডায়িং ফোক কালচার' (Aalkaap—A Dying Folk Culture) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলকাপ বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার যআ ক্রমশ মৃতপ্রায়৷ রাজা সেন সেই সংস্কৃতির ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে তথ্যচিত্রে ধরেছিলেন। ছবিটির জন্য ২০০৫ সালে BFJA-র সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কারও পান।
- 15
- 17
এখানেই সম্ভবত রাজা সেনের তথ্যচিত্র নির্মাণের আসল গুরুত্ব। সুচিত্রা মিত্র বা শম্ভু মিত্রের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে নথিবদ্ধ করা যেমন সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণ, তেমনই আলকাপের মতো লোকসংস্কৃতিকে ধরে রাখা মানে এমন এক জগতকে সংরক্ষণ করা, যা মূলধারার ইতিহাসের পাতায় সহজেই হারিয়ে যেতে পারে।
- 16
- 17
রাজা সেনের তথ্যচিত্রগুলি এককথায় বাংলা শিল্প ও সংস্কৃতির ইতিহাসের এক শৈল্পিক দলিল৷ সুচিত্রা মিত্র থেকে তপন সিনহা, শম্ভু মিত্র থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময়ী দেবী থেকে সমরেশ বসু, অন্যদিকে কলকাতা, সুন্দরবন ও আলকাপ—সব মিলিয়ে তাঁর ক্যামেরা যেন বাংলার সাংস্কৃতিক মানচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছে।
- 17
- 17















