শ্রাদ্ধের প্রথা কীভাবে এসেছিল? পিতৃপক্ষে প্রথম শ্রাদ্ধ কে করেছিলেন? পুরাণে রয়েছে চমকে দেওয়ার মতো কাহিনি
নিজস্ব সংবাদদাতা
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ : ০২
শেয়ার করুন
1
11
পিতৃপক্ষ মানেই পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের উদ্দেশে তর্পণ, পিণ্ডদান এবং শ্রাদ্ধ। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়ে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। কিন্তু জানেন কি, শ্রাদ্ধের প্রথা কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং প্রথম কে এই আচার পালন করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ধর্মগ্রন্থে রয়েছে একাধিক কাহিনি ও মত।
2
11
মহাভারতের অনুশাসন পর্বে শ্রাদ্ধের প্রথা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, অত্রি মুনি প্রথম শ্রাদ্ধের উপদেশ দিয়েছিলেন এবং মহর্ষি নিমি প্রথম শ্রাদ্ধ পালন করেছিলেন। পরে অন্যান্য ঋষির মধ্যেও এই প্রথা ছড়িয়ে পড়ে।
3
11
অন্য একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যায় অবশ্য বলা হয়েছে, মনু প্রথম শ্রাদ্ধ করেছিলেন এবং সেই কারণেই তাঁকে শ্রাদ্ধের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, কোন ধর্মগ্রন্থ বা পরম্পরা অনুসরণ করা হচ্ছে তার উপর এই কাহিনির বিবরণে পার্থক্য দেখা যায়।
4
11
কেন শুরু হয়েছিল শ্রাদ্ধের প্রথা?পুরাণকথায় বলা হয়, ঋষি-মুনিরা যখন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে নিয়মিত অন্ন নিবেদন করতে শুরু করেন, তখন ধীরে ধীরে এই আচার আরও বিস্তৃত হয়। দেবতা এবং পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে অন্ন নিবেদনের ফলে শ্রাদ্ধ একটি নিয়মিত ধর্মীয় আচারে পরিণত হয়।
5
11
কাহিনি অনুযায়ী, একসময় পিতৃপুরুষ ও দেবতাদের সামনে একটি সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত অন্ন গ্রহণের ফলে তাঁরা অসুবিধায় পড়েন। তখন তাঁরা ব্রহ্মার কাছে সমাধানের জন্য যান। ব্রহ্মা তাঁদের জানান, এই সমস্যার সমাধান করবেন অগ্নিদেব।
6
11
এরপর অগ্নিদেব জানান, শ্রাদ্ধের অন্নের সঙ্গে তাঁরও সম্পর্ক থাকবে। সেই থেকেই শ্রাদ্ধের অন্ন প্রথমে অগ্নিকে নিবেদন করার রীতি তৈরি হয়েছে বলে একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়। হিন্দু ধর্মীয় আচারে অগ্নিকে দেবতা ও মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। শ্রাদ্ধের ক্ষেত্রেও সেই বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। অগ্নির মাধ্যমে নিবেদন করা অন্ন পিতৃপুরুষদের কাছে পৌঁছয়, এমন ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে।
7
11
প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলিতেও শ্রাদ্ধের আচারবিধিতে অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। অগ্নি পুরাণে শ্রাদ্ধের বিভিন্ন নিয়মের পাশাপাশি পিতৃপুরুষদের আহ্বান, তিল ও জল নিবেদন এবং অগ্নিতে আহুতির কথাও বলা হয়েছে।
8
11
পিতৃপক্ষে কেন করা হয় শ্রাদ্ধ?পিতৃপক্ষকে পূর্বপুরুষদের স্মরণের বিশেষ সময় হিসেবে মনে করা হয়। এই সময়ে মৃত আত্মীয়দের উদ্দেশে তর্পণ, পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধ করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
9
11
পিতৃপক্ষের সঙ্গে জড়িত আরও একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি হল মহাভারতের কর্ণের কাহিনি। বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর কর্ণ স্বর্গে গিয়ে দেখেন, তাঁর জন্য খাদ্যের বদলে সোনা উপস্থিত হচ্ছে। কারণ জীবিত অবস্থায় তিনি প্রচুর দান করলেও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অন্নদান করেননি। পরে তাঁকে পৃথিবীতে ফিরে এসে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অন্ন ও জল নিবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়। এই কাহিনিকেও পিতৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রচলিত কিংবদন্তি হিসেবে বলা হয়।
10
11
শ্রাদ্ধ শব্দের মধ্যেই রয়েছে ‘শ্রদ্ধা’। তাই ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এই আচারের মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম পালন নয়, বরং প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। পিতৃপক্ষ সেই স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনেরই একটি বিশেষ সময়।
11
11
তবে শ্রাদ্ধের নিয়ম, কে করবেন, কোন তিথিতে করবেন এবং কীভাবে করবেন, এসব বিষয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মীয় পরম্পরায় পার্থক্য রয়েছে। তাই কোনও নির্দিষ্ট আচার পালনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পুরোহিত বা নিজস্ব পারিবারিক পরম্পরা অনুসরণ করাই প্রচলিত রীতি।