কেন গণেশের বাহন ইঁদুর, বড় কান থেকে একদন্ত, বিশাল পেট, প্রতিটির রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য, জানেন কী?
নিজস্ব সংবাদদাতা
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮ : ২৮
শেয়ার করুন
1
12
গণেশ চতুর্থী এলেই ঘরে ঘরে আসে সিদ্ধিদাতা গণেশের মূর্তি। কোথাও তিনি একদন্ত, কোথাও চার হাত, কোনও মূর্তিতে হাতে থাকে মোদক, কোনওটিতে পদ্ম, আবার কোনওটিতে দেখা যায় কুঠার, পাশ বা অঙ্কুশ। পায়ের কাছে থাকে ছোট্ট ইঁদুর। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, গণেশের মূর্তিতে থাকা এই প্রতিটি জিনিসের আলাদা আলাদা অর্থ রয়েছে?
2
12
হিন্দু ধর্মীয় আইকনোগ্রাফিতে দেবদেবীর মূর্তির বিভিন্ন অঙ্গ, অস্ত্র, বাহন এবং হাতে ধরা বস্তু নিছক সাজসজ্জার জন্য নয়। প্রতিটির মধ্যেই কোনও না কোনও আধ্যাত্মিক বার্তা বা প্রতীকী অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। গণেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
3
12
কেন গণেশের বাহন ইঁদুর? আকারে বিশাল গণেশের বাহন হিসেবে একটি ছোট্ট ইঁদুরকে দেখানো হয়—এই বৈপরীত্যের মধ্যেই রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। প্রচলিত ব্যাখ্যায় ইঁদুর মানুষের অস্থির মন, লোভ, ইচ্ছা এবং বাসনার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। ইঁদুর যেমন ছোট ছোট ফাঁক দিয়েও ঢুকে পড়তে পারে, মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাও তেমনই নানা পথে মনে প্রবেশ করে। গণেশের পায়ের কাছে ইঁদুর থাকার অর্থ, সেই অস্থিরতা ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।অন্য একটি ব্যাখ্যায় ইঁদুর বাধা বা বিঘ্নের প্রতীক। গণেশ যেহেতু বিঘ্নহর্তা, তাই তাঁর বাহন হিসেবেও এমন প্রাণীকে দেখানো হয়েছে, যাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাধা জয় করার ভাবনাটি প্রকাশ পায়। গণেশের সঙ্গে ইঁদুরের সম্পর্কের উল্লেখ বিভিন্ন পুরাণে পাওয়া যায়৷
4
12
হাতে মোদক কেন? গোলাকার, মিষ্টি এই প্রসাদকে গণেশের অত্যন্ত প্রিয় বলে মনে করা হয়। ‘মোদক’ শব্দটির সঙ্গে আনন্দ ও পরিতৃপ্তির ধারণা যুক্ত। তাই গণেশের হাতে থাকা মোদককে জ্ঞান, সাধনা ও সৎকর্মের মাধ্যমে পাওয়া অন্তরের আনন্দের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।বাইরের আবরণ শক্ত হলেও ভিতরে থাকে মিষ্টি পুর—এটিকেও জ্ঞানের একটি রূপক হিসেবে দেখা হয়। জীবনের বাইরের কঠিন পথ পেরিয়ে ভিতরের সত্য বা জ্ঞানের সন্ধান পাওয়ার বার্তা যেন লুকিয়ে রয়েছে মোদকের মধ্যে।
5
12
পদ্মফুলের অর্থ কী? গণেশের কিছু রূপে হাতে পদ্মফুল দেখা যায়। ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পদ্ম পবিত্রতা, সৌন্দর্য এবং আত্মিক বিকাশের প্রতীক। পদ্ম কাদাজলে জন্মালেও তার পাপড়িতে কাদার দাগ থাকে না। তাই জাগতিক জীবনে থেকেও কীভাবে নিজেকে নেতিবাচকতা থেকে দূরে রেখে শুদ্ধ থাকা যায়, পদ্ম সেই বার্তা বহন করে।
6
12
কুঠার বা পরশু কী বোঝায়?গণেশের কোনও কোনও মূর্তিতে হাতে দেখা যায় কুঠার বা পরশু। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।প্রচলিত ব্যাখ্যায় কুঠার মানুষের জীবনের অপ্রয়োজনীয় আসক্তি, মোহ ও বন্ধন ছিন্ন করার প্রতীক। জীবনে এগিয়ে যেতে গেলে অনেক সময় এমন কিছু অভ্যাস, ভয় বা আসক্তি ছেড়ে দিতে হয়, যা আমাদের পিছনে টেনে রাখে। কুঠার সেই বন্ধন কাটার শক্তির প্রতীক।
7
12
গণেশের হাতে অনেক সময় একটি পাশ বা দড়ির মতো বস্তু দেখা যায়। সংস্কৃত ‘পাশ’ বলতে বন্ধন বা ফাঁস বোঝানো হয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এটি মানুষের মনকে সঠিক পথে ধরে রাখার প্রতীক।
8
12
গণেশের হাতে দেখা যায় আর একটি পরিচিত প্রতীক হল অঙ্কুশ—হাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ যন্ত্র।গণেশ নিজেই হাতিমুখী দেবতা। তাই তাঁর হাতে অঙ্কুশের উপস্থিতি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মন, ইন্দ্রিয় এবং জীবনের গতিপথকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। জীবনের পথে যখন মানুষ লক্ষ্যচ্যুত হয়, তখন তাকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার শক্তিই অঙ্কুশের প্রতীকী অর্থ।
9
12
ভাঙা দাঁত কেন?গণেশের একটি দাঁত সম্পূর্ণ এবং অন্যটি ভাঙা—এই বৈশিষ্ট্য থেকেই তাঁর অন্যতম নাম ‘একদন্ত’।গণেশের ভাঙা দাঁতকে ত্যাগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জ্ঞানের জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জনের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পুরাণের বিভিন্ন কাহিনিতে গণেশের ভাঙা দাঁত নিয়ে একাধিক গল্প প্রচলিত রয়েছে।একটি জনপ্রিয় কাহিনিতে বলা হয়, মহাভারত লিখে রাখার সময় ব্যাসদেবের বাণী থেমে না যাওয়ার জন্য গণেশ নিজের দাঁত ভেঙে লেখনী হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ফলে তাঁর একদন্ত রূপ জ্ঞান ও কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
10
12
বড় কান: জ্ঞান অর্জনের জন্য মন দিয়ে শোনা জরুরি। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, মানুষের কথা এবং চারপাশের জগতের শিক্ষা গ্রহণ করার প্রতীক হিসেবেও গণেশের বড় কানকে দেখা হয়।
11
12
গণেশের শুঁড়ের মধ্যে রয়েছে শক্তি এবং সূক্ষ্মতার এক অদ্ভুত সমন্বয়। হাতির শুঁড় দিয়ে যেমন ভারী জিনিস সরানো সম্ভব, তেমনই অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজও করা যায়।তাই গণেশের শুঁড়কে অনেক সময় জীবনের বড় সমস্যা সামলানোর পাশাপাশি ছোটখাটো বিষয়েও সচেতন থাকার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
12
12
জীবনের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ, প্রশংসা-সমালোচনা—সবকিছুকে ধারণ করার ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে তাঁর বড় পেটকে দেখা হয়। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া, কিন্তু নেতিবাচকতার দ্বারা নিজেকে প্রভাবিত না হতে দেওয়াই যেন এই প্রতীকের মূল বার্তা।গণেশের মূর্তির প্রতিটি অংশই যেন একটি শিক্ষা।