'ভেবেছিলাম রফি সাহেবই সব গান গেয়ে দেবেন', কিশোর, রফি, হেমন্তের দিনে উপেক্ষার চৌকাঠ পেরিয়ে 'জলসাঘরে' মান্না দে
নিজস্ব সংবাদদাতা
১ মে ২০২৬ ১৭ : ০৫
শেয়ার করুন
1
15
হিন্দি এবং বাংলা সঙ্গীত জগতে মান্না দে এক অবিস্মরণীয় নাম। কিন্তু একটা সময় এমন ছিল যখন মহম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মুকেশ এবং তালাত মাহমুদের মতো শিল্পীদের দাপটে মান্না দে-র মতো প্রতিভাবান শিল্পীর মনেও সংশয় তৈরি হয়েছিল।
2
15
যদিও মান্না দে কখনওই ভাগ্যকে দোষ দেননি৷ এক সাক্ষাৎকারে নিজেই জানিয়েছিলেন, "রফি সাহেব বা মুকেশজিরা যে ধরনের রোমান্টিক বা গান গাইতেন, সেগুলোতে তাঁরাই সেরা ছিলেন।"
3
15
নিজে এত গুণী শিল্পী হয়েও অন্য শিল্পীর গুণমুগ্ধতা প্রকাশে কখনও কার্পণ্য করেননি মান্না দে। রফি সাহেবের প্রতি মুগ্ধতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "যদি ওই গানগুলো আমি গাইতাম এবং রফি সাহেবের সঙ্গে আমার প্রতিযোগিতা হত, তবে রফি সাহেবই বাজিমাত করতেন।"
4
15
কেরিয়ারে যখন নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে চাইছেন মান্না দে, তখন তাঁর কাছে যে গান এসেছে সেই গানেই তিনি নিজেকে উজার করে দিয়েছেন৷
5
15
কঠিন এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নির্ভর গানের জন্য পরিচালকদের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠেন মান্না দে। 'রামরাজ্য' (১৯৪৩) সিনেমায় একটি বড় সুযোগ পান তিনি। শচীন দেববর্মণের সুরে 'মশাল' ছবিতে 'উপর গগন বিশাল' গানটি তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
6
15
মান্না দে-এর কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে (কে সি দে) এর কাছে গান শিখতেন শচীন দেব বর্মন৷ মান্না দে ছিলেন শচীন দেব বর্মনের ভক্ত৷ অনুরাগ এমন যে নাকি সুরে গান গাওয়াও নকল করেছিলেন মান্না দে। যদিও পরবর্তীকালে কাকার পরামর্শে নিজস্ব সঙ্গীতের স্টাইল তৈরি করেন মান্না দে৷
7
15
'শ্রী ৪২০' এবং রাজ কাপুরের রোমান্টিক গান রাজ কাপুরের কণ্ঠ হিসেবে মুকেশ পরিচিত হলেও, 'শ্রী ৪২০' সিনেমায় 'প্যায়ার হুয়া ইকরার হুয়া' গানটি মান্না দে-কে দিয়ে গাওয়ানো হয়। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, লতা মঙ্গেশকরের স্কেলের সঙ্গে মেলানোর জন্য শঙ্কর-জয়কিশনের এমন একজন গায়কের প্রয়োজন ছিল যাঁর রেঞ্জ অনেকটা উঁচুতে পৌঁছাতে পারে। গানটি সুপারহিট হওয়ার পর রাজ কাপুর স্বয়ং তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এই গানের পর থেকেই মান্না দে রোমান্টিক গানের জন্যও পরিচালকদের ডাক পেতে শুরু করেন।
8
15
হিন্দি গানে প্রতিষ্ঠা পেলেও বাংলায় তখন হেমন্তের দিন। 'গলি থেকে রাজপথ' সিনেমায় প্রথমবার উত্তম কুমারের কণ্ঠে গান গাওয়ার কথা ছিল মান্না দে-এর৷ কিন্তু ছবির ডিস্ট্রিবিউটররা বাধা দিয়ে বলেন যে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছাড়া উত্তম কুমারের গলায় অন্য কারও গান দর্শক গ্রহণ করবে না।
9
15
শেষ পর্যন্ত অনেক তর্কবিতর্কের পর ঠিক হয় যে, উত্তম কুমারের লিপে নয়, বরং অন্য কোনো চরিত্রের লিপে মান্না দের গান ব্যবহার করা হবে। সেই সিনেমায় তাঁর গাওয়া 'এই দুনিয়া ভাই সবেরই' গানটি প্রবল জনপ্রিয়তা পায় এবং এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
10
15
'পড়োশন' সিনেমায় কিশোর কুমারের সঙ্গে তাঁর বিখ্যাত যুগলবন্দী 'এক চতুর নার' গান প্রসঙ্গে মান্না দে বলেছিলেন এই গান লাইভ, রেকর্ডিংয়ের সময় কিশোর কুমার, আর ডি বর্মন এবং মেহমুদ মিলে গানটিতে এমন কিছু অদ্ভুত সুর এবং ছন্দ তৈরি করেছিলেন যা কাগজে লেখা ছিল না। তাঁরা একে অপরের সঙ্গে মজা করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে গানটিতে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
11
15
'বসন্ত বাহার' সিনেমায় পণ্ডিত ভীমসেন জোশীর সঙ্গে 'কেতকী গুলাব জুহি' গানটি গাওয়ার সময় মান্না দে চরম দ্বিধায় পড়েছিলেন। তিনি ১৫ দিনের জন্য মুম্বই ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন! তাঁর ভয় ছিল যে, একজন কিংবদন্তি শাস্ত্রীয় শিল্পীর সঙ্গে তিনি কীভাবে টেক্কা দেবেন। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর উৎসাহে এবং সঙ্গীত পরিচালক বসন্ত দেশাইয়ের ভরসায় তিনি গানটি রেকর্ড করেন।
12
15
গান্ধীজিস লেটার টু মণিবেন প্যাটেল (Gandhiji’s letter to Maniben Patel) এই নামে প্রচলিত গান, এর উৎস একটি ব্যক্তিগত চিঠি।
মহাত্মা গান্ধী তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মণিবেন প্যাটেলকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠির ভাষা ও ভাবনা এতটাই আবেগপূর্ণ ও দার্শনিক ছিল যে, পরবর্তীতে সেটিকে গানের রূপ দেওয়া হয়। এই লেখা থেকেই একটি ভক্তিমূলক/আধ্যাত্মিক গান তৈরি হয়, যা গেয়েছিলেন মান্না দে।
13
15
স্কুলজীবনে রসিকতা করতে খুব ভালবাসতেন মান্না দে৷ প্রবোধ চন্দ্র দে স্কুলজীবনেই সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ অনুভব করেন৷ পরবর্তীকালে মান্না দে হয়ে ওঠা৷ বাংলা ছাড়াও হিন্দি, মালয়ালম, গুজরাটি, মারাঠি, অসমিয়া, পাঞ্জাবি, ভোজপুরি ও কন্নড় ভাষায় গান গেয়েছেন মান্না দে৷
14
15
১৯৪২ সালে তমান্না সিনেমার মধ্য দিয়ে গানের যাত্রা শুরু৷ ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন মান্না দে৷ ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৭ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছেন।
15
15
তরুণ বয়সে মান্না দে গানের পাশাপাশি কুস্তিও লড়তেন, নিয়মিত কুস্তি শিখতেন বিখ্যাত কুস্তিগির গোবর গুহর কাছে৷ সর্বভারতীয় স্তরে কুস্তিও লড়েছিলেন৷ গানকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পরেও তিনি শরীরচর্চা ছাড়েননি। ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন তিন ঘণ্টা রেওয়াজের পাশাপাশি অন্তত আধঘণ্টা ব্যায়াম করতেন। শৃঙ্খলা এবং ধৈর্যের আধারেই ’জীবনের জলসাঘরে’ আলোকিত নক্ষত্র মান্না দে৷