পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতের কোটি কোটি পরিবারের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক নতুন বিষয়—রান্নার গ্যাসের সরবরাহ। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে দেশে তৈরি হয়েছে এক ধরনের “গ্রেট গ্যাস রিজিগ” বা গ্যাস ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের আলোচনা। এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠেছে—সঙ্কটের সময়ে ঐতিহ্যবাহী লাল এলপিজি সিলিন্ডার বেশি নির্ভরযোগ্য, নাকি আধুনিক পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস পিএনজি?
2
10
কেন্দ্র সরকার ইতিমধ্যেই তাদের আইনের হিসেব অনুসারে গ্যাস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার এলপিজি এবং পিএনজি—দু’টিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। তবে এই দুই জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে, যা সংকটের সময়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
3
10
পিএনজি-র সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এর “অদৃশ্য” সরবরাহ ব্যবস্থা। এলপিজি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে বিশাল ট্রাক নেটওয়ার্ক, বোতলজাত কারখানা এবং ডেলিভারি কর্মীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি বা আতঙ্কে অতিরিক্ত বুকিংয়ের ফলে এই পুরো ব্যবস্থায় চাপ পড়ে। অনেক গ্রাহককে আবার ২৫ দিনের বুকিং নিয়মের কারণে অপেক্ষা করতে হয়।
4
10
অন্যদিকে পিএনজি সরাসরি মাটির নিচে থাকা পাইপলাইনের মাধ্যমে বাড়িতে পৌঁছে যায়। ফলে রাস্তার যানজট, পরিবহন সমস্যা বা শেষ পর্যায়ের ডেলিভারি সমস্যার প্রভাব পড়ে না। পিএনজি ব্যবহারকারীরা তাদের গড় ব্যবহার অনুযায়ী প্রায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পান, তাই সিলিন্ডার বুকিং বা লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলাও নেই।
5
10
নিরাপত্তার দিক থেকেও পিএনজি কিছুটা এগিয়ে। প্রাকৃতিক গ্যাস বাতাসের তুলনায় হালকা, ফলে লিক হলে এটি দ্রুত উপরে উঠে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু এলপিজি বাতাসের চেয়ে ভারী হওয়ায় লিক হলে মেঝের কাছে জমে থাকে এবং বন্ধ ঘরে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ায়।
6
10
এছাড়া পিএনজি খুব কম চাপের (প্রায় ২১ মিলিবার) মধ্যে সরবরাহ করা হয়। বিপরীতে এলপিজি সিলিন্ডারে গ্যাস উচ্চচাপে তরল অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। সঙ্কটের সময় জরুরি পরিষেবা ব্যস্ত থাকলে কম চাপের গ্যাস ব্যবস্থায় বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে। পিএনজি লাইনে সাধারণত রান্নাঘরের ভিতরে ও বাইরে আলাদা আইসোলেশন ভালভ থাকে, যা প্রয়োজনে সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস বন্ধ করে দিতে পারে।
7
10
সরকারি নীতিতেও এখন “প্রথমে গৃহস্থালি”—এই অগ্রাধিকার স্পষ্ট।আইন অনুযায়ী, রান্নাঘরের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রথম লক্ষ্য। ভারতের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসে, যা মূলত পিএনজি নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
8
10
অন্যদিকে এলপিজি সরবরাহ অনেক বেশি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ভারত প্রায় ৬০ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে, যার বড় অংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে উত্তেজনা বা জাহাজ চলাচলে সমস্যা হলে এলপিজি সরবরাহে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
9
10
তবে বাস্তবতা হল, ভারতের গ্রাম ও ছোট শহরগুলিতে এখনও এলপিজি সিলিন্ডারই প্রধান ভরসা। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে বড় শহরগুলিতে পিএনজি নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতের জন্য অনেক বেশি স্থিতিশীল সমাধান হতে পারে।
10
10
সরকার ইতিমধ্যেই আরও শহরকে নতুন নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংঘাতই হয়তো সেই “টার্নিং পয়েন্ট” হতে পারে, যা ভারতকে ধীরে ধীরে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ হওয়া গ্যাসভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে—যেখানে প্রতিদিনের রান্না আর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার ওপর এতটা নির্ভরশীল থাকবে না।