মুম্বইয়ের ধারাভি—এশিয়ার বৃহত্তম বস্তিগুলির একটি। লেখক, কবি, চলচ্চিত্রকার—অনেকে এই জায়গাকে নিয়ে গল্প বলেছেন, আবার সময় ও ভাগ্যও একে বারবার বদলে দিয়েছে। তবু এই জায়গা বারবার ফিরে আসে আলোচনায়, কারণ এখানে এমন এক বাস্তবতা আছে যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। ছবি: সংগৃহীত
2
8
ধারাভি আসলে শহরের ভেতরে আরেকটি শহর। এখানে বহু মানুষের জীবন শুরু হয়, বড় হয়, এবং শেষও হয়—বস্তির সরু গলির মধ্যেই। এখানকার বাসিন্দা প্লাম্বার রাজু হনুমন্তা বলেন, “গাটার হ্যায়, পার সোনে কা হ্যায়”—অর্থাৎ, “এটা নর্দমা হলেও সোনার মতো মূল্যবান।” এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ধারাভির অর্থনীতি ও জীবনযুদ্ধের সারকথা। মাত্র ২.৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ বাস করেন এখানে। কিন্তু এই ছোট্ট এলাকাই বছরে প্রায় ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করে বলে ধারণা World Bank ও UN‑Habitat-এর মতো সংস্থার। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা।ছবি: সংগৃহীত
3
8
ধারাভির গলিতে হাঁটলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা একসঙ্গে দেখা যায়—একদিকে দারিদ্র্য, স্যাঁতসেঁতে ঘর, নোংরা নর্দমা, অন্যদিকে হাজার হাজার ছোট ব্যবসা, যা মুম্বই শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখে। এখানে অ্যাম্বুলেন্স, দমকল বা পুলিশের গাড়ি পর্যন্ত ঢুকতে পারে না। কিন্তু তবুও হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এখান থেকে কাজ করে পুরো শহরে পণ্য ও পরিষেবা পৌঁছে দেয়। ছবি: সংগৃহীত
4
8
ধারাভি মূলত শ্রমজীবী অভিবাসীদের প্রথম আশ্রয়স্থল। ভাড়ার একটি ছোট্ট ১০০ বর্গফুট ঘরের জন্য মাসে ৩,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা দিলেই চলে। পুলিশ যাচাই নেই, স্থায়ী জল বা নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই একই বস্তিতে ব্যবসার জন্য ভাড়ার দাম মাসে ১.৫ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ধারাভিতে রয়েছে ২০ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোগ—গার্মেন্টস ইউনিট, পুনর্ব্যবহার কারখানা, খাদ্য ব্যবসা, চামড়া শিল্প, মৃৎশিল্প এবং আরও অনেক কিছু। ছোট ছোট ঘরে ১০০-১৫০ বর্গফুট জায়গাতেই চলে পুরো কারখানা। ছবি: সংগৃহীত
5
8
সবচেয়ে পরিচিত শিল্পগুলির একটি হলো চামড়ার ব্যবসা। উনবিংশ শতাব্দী থেকে ধারাভির অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই শিল্প। পাঁচ হাজারের বেশি ছোট কারখানায় ব্যাগ, জ্যাকেট, মানিব্যাগ, জুতো এবং নানা চামড়ার পণ্য তৈরি হয়। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু কারিগর দলিত চামার সম্প্রদায় থেকে আসা। অনেক পণ্যের কাঁচামাল আসে কানপুর ও চেন্নাই থেকে, আর তৈরি পণ্য পৌঁছে যায় ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও। ভারতের চামড়া রপ্তানি শিল্পের মূল্য ২০২৪-২৫ সালে ছিল প্রায় ৪.৮৩ বিলিয়ন ডলার। ছবি: সংগৃহীত
6
8
চামড়া শিল্পের পাশাপাশি ধারাভির আরেকটি বড় কেন্দ্র হলো কুম্ভরবরা, যা এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মৃৎশিল্প এলাকা। এখানে হাজারেরও বেশি কুমোর পরিবার দীপাবলির প্রদীপ, কুলহড়, ফুলের টব ও নানা ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরি করেন। এই ব্যবসার বার্ষিক আয় প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। খাবারের ব্যবসাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কর্নাটক ও কেরল থেকে আসা মানুষ ভোর রাত থেকেই ইডলি, বড়া ও ফিল্টার কফি তৈরি করেন। সেগুলো পরে ছোট বিক্রেতারা সাইকেলে করে মুম্বইয়ের নানা এলাকায় বিক্রি করেন—বান্দ্রা থেকে কান্দিভলি পর্যন্ত। ছবি: সংগৃহীত
7
8
ধারাভির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অপ্রকাশিত শিল্প হলো বর্জ্য পুনর্ব্যবহার। এখানে প্রায় ২.৫ লক্ষ র্যাগপিকার ও স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী মুম্বইয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ কঠিন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করেন—যার পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার টন। প্লাস্টিক, ধাতু, কাগজ—সবকিছু আলাদা করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরি করা হয়। এই সবকিছুর মাঝেই রয়েছে কঠিন বাস্তবতা—দূষণ, রোগ, কাজের নিরাপত্তাহীনতা এবং অত্যন্ত কম মজুরি। অনেক কারিগর একটি চামড়ার ব্যাগ বানিয়ে মাত্র ২০০-৩০০ টাকা লাভ পান। তবু এই ক্ষুদ্র শিল্পগুলোই মুম্বইয়ের বিশাল অর্থনীতির অদৃশ্য ভিত্তি। ছবি: সংগৃহীত
8
8
এখন ধারাভির সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে পুনর্বিকাশ প্রকল্পকে ঘিরে। বহু বাসিন্দার আশঙ্কা, এই প্রকল্পটি পুনর্বাসনের বদলে বড় রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে পরিণত হতে পারে এবং বহু মানুষ হয়তো নতুন ধারাভিতে থাকার সুযোগই পাবেন না। তবু এখানকার মানুষদের বিশ্বাস—ভবন বদলাতে পারে, কিন্তু ধারাভির চরিত্র বদলানো কঠিন। যেমন এক স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী বলেছিলেন, “নতুন বিল্ডিং তৈরি হতে পারে, কিন্তু ধারাভির স্বভাব বদলানো যায় না।” এই কারণেই হয়তো প্লাম্বার হনুমন্তার কথাটাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়ে ওঠে—“এটা নর্দমা, কিন্তু সোনার মতো মূল্যবান।” ছবি: সংগৃহীত