১৫ বছরে বিয়ে, চার মাসের মেয়ে কোলে ১৮-তে বিধবা, নিজের জেদেই শেষ হাসি হেসেছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার
নিজস্ব সংবাদদাতা
২৪ আগস্ট ২০২৬ ১৫ : ৪৩
শেয়ার করুন
1
13
আজ মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া বা STEM ক্ষেত্রে কাজ করা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন মেয়েদের উচ্চশিক্ষাই ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর সেই সময়েই সমাজের যাবতীয় বাধা অতিক্রম করে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন ললিতা।
2
13
মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়। ১৮ বছর বয়সে তিনি কন্যাসন্তানের মা হন এবং মেয়ের জন্মের মাত্র চার মাস পরেই স্বামীকে হারান। এরপর একা সন্তানকে মানুষ করার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৩ সালে ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম লেখান ললিতা।
3
13
১৯১৯ সালের ২৭ আগস্ট মাদ্রাজ, অর্থাৎ বর্তমান চেন্নাইয়ে জন্ম ললিতার। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় অবশ্য ছোট থেকেই। তাঁর বাবা পাপ্পু সুব্বারাও ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যও ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।
4
13
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ললিতার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পরও তাঁর বাবা চাইতেন মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাক। পরিবারের উৎসাহে তিনি মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করেন এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার পথেও এগিয়ে যান। মেয়ের জন্মের চার মাস পরেই তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ একদিকে সদ্যোজাত সন্তান, অন্যদিকে অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে তাঁর সামনে তখন জীবনটা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
5
13
কিন্তু পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি ললিতা। বরং তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন এবং মেয়েকেও নিজের মতো করে বড় করবেন। বাবার সহযোগিতায় আবার পড়াশোনায় মন দেন তিনি।
6
13
ললিতার সামনে তখন একাধিক পেশার রাস্তা খোলা ছিল। চিকিৎসাবিদ্যার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু ছোট মেয়েকে মানুষ করার দায়িত্বের কথা মাথায় রেখে এমন একটি পেশা বেছে নিতে চেয়েছিলেন, যেখানে নিজের দায়িত্বের পাশাপাশি সন্তানের যত্ন নেওয়াও সম্ভব হবে।
7
13
শেষ পর্যন্ত বাবার পথ অনুসরণ করে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। সেই সময় ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত পুরুষদের ক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচিত হত।
8
13
ললিতা ভর্তি হন মাদ্রাজের College of Engineering, Guindy-তে। সেই সময় কলেজটি কার্যত পুরুষদেরই প্রতিষ্ঠান ছিল। শত শত পুরুষ ছাত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র মহিলা। তাঁর বাবা মেয়ের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। শেষ পর্যন্ত বিশেষ অনুমতিতে ললিতাকে ভর্তি নেওয়া হয়।
9
13
কলেজের পড়াশোনা, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার প্রস্তুতি, অন্যদিকে ছোট মেয়ের দায়িত্ব, সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। পরিবারের সাহায্যও ছিল তাঁর এই অসম্ভব লড়াইয়ের অন্যতম শক্তি।
10
13
অবশেষে ১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন ললিতা। তিনিই হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার। সার্টিফিকেটে পুরুষদের জন্য লেখা ‘He’ শব্দটি কেটে ‘She’ লেখা হয়েছিল।
11
13
ডিগ্রি পাওয়ার পরও থেমে থাকেননি ললিতা। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত হন। অর্থাৎ তাঁর লড়াই শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্য ছিল না—তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন মহিলা একই সঙ্গে মা এবং সফল পেশাজীবীও হতে পারেন।
12
13
১৯৬৪ সালে নিউইয়র্কে International Conference of Women Engineers and Scientists-এ ভারতীয় মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বক্তব্যও রাখেন ললিতা। তাঁর জীবন সেই সময়ের ভারতীয় সমাজে মহিলাদের অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের এগিয়ে আসার পথের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।
13
13
১৯৪৩ সালে ভারতের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে তিনি শুধু নিজের জীবনই বদলাননি, তাঁর পরের প্রজন্মের অসংখ্য মেয়ের জন্যও খুলে দিয়েছিলেন নতুন সম্ভাবনার দরজা।