রাজনৈতিক মানচিত্রের ব্যাপক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভারত। এক তৃতীয়াংশ মহিলা সংরক্ষণের জন্য ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল ২০২৬’ এবং লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য বিল পেশ করতে চলেছে কেন্দ্র।
2
17
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে ‘সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল, ২০২৬’ পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্র। বিলটিতে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রকে বিরোধী দলের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে।
3
17
সরকার এই সম্প্রসারণকে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ (৩৩% নারী সংরক্ষণ) বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু বিরোধী দলগুলি এটিকে একটি বিতর্কিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়ার জন্য একটি ‘রাজনৈতিক কৌশল’ বলে অভিহিত করছে।
4
17
একটি সাংবিধানিক সংশোধনী হিসেবে, বিলটির জন্য ধারা ৩৬৮ অনুযায়ী একটি ‘বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ প্রয়োজন। এর অর্থ হল, বিলটিকে প্রতিটি কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সেই সঙ্গে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে।
5
17
লোকসভায় বর্তমান কার্যকর সদস্য সংখ্যা ৫৪৩ জন। যদি সকল সাংসদ উপস্থিত থেকে ভোট দেন, তবে বিলটি পাস হওয়ার জন্য কমপক্ষে ৩৬০ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
6
17
শাসকদল এনডিএ-র বর্তমানে ২৯৩ জন সাংসদ রয়েছেন, ফলে তাদের প্রায় ৬৭ ভোটের ঘাটতি রয়েছে। বিরোধী জোটের ২৩৪ জন সাংসদ রয়েছেন। যা সরকারকে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে বাধা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
7
17
বিরোধী দলের মধ্যে একটি ছোট গোষ্ঠীও বিলটি আটকে দিতে পারে। চারটি বৃহত্তম বিরোধী দল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি (এসপি), তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এবং দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) এক সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনের অধিকারী। এর ফলে, বিরোধী দলের সমর্থন ছাড়া সরকারের পক্ষে আইনটি পাশ করানো কঠিন।
8
17
তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি)-র মতো প্রধান মিত্রদের সিদ্ধান্ত নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। টিডিপি-র ১৬ জন সাংসদ রয়েছেন এবং যারা দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে সীমানা পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
9
17
লোকসভায় পাস হওয়ার পর রাজ্যসভায় বিলটি পেশ করা হবে। সেখানে শাসকদল এনডিএ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে এখনও পিছিয়ে আছে।
10
17
মোট ২৪৪ জন সদস্যের মধ্যে, যদি সকল সদস্য উপস্থিত থেকে ভোট দেন, তবে বিলটির জন্য কমপক্ষে ১৬৩টি ভোটের প্রয়োজন হবে। এনডিএ-র সদস্য সংখ্যা ১৪১।
11
17
২০২৭ সালের জনগণনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইছে না কেন্দ্র। ২০১১ সালের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতেই সীমানা পুনর্বিন্যাস করার ইচ্ছে কেন্দ্রের। যদি ৮৫০টি আসন পর্যন্ত লোকসভার আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে বিরোধী রাজ্যগুলির কি সুবিধা হবে?
12
17
বর্তমানে লোকসভায় সবচেয়ে বেশি আসন রয়েছে উত্তরপ্রদেশে ৮০টি (১৪.৭ শতাংশ) পুনর্বিন্যাসের ফলে আসন হবে ১৪০টি (মোট আসনের ১৬.৫ শতাংশ) অর্থাৎ শতাংশের হারে ১.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। একই সুবিধা পাবে বিজেপি-শাসিত বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র।
13
17
অনেক রাজ্যের শতাংশের হারে ক্ষতিও হবে। যেমন তামিলনাড়ুর বর্তমানে ৩৯ জন সাংসদ রয়েছেন লোকসভায়। শতাংশের হারে ৭.২ শতাংশ। আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে সাংসদ সংখ্যা হবে ৫১ জন অর্থাৎ মোট আসন সংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, ১.২ শতাংশ আসন কমবে।
14
17
ক্ষতির মুখোমুখি হবে কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলাঙ্গানা, উড়িষ্যা। অনেক কম ক্ষতির সম্মুখীন হবে বিরোধী-শাসিত পশ্চিমবঙ্গ। বর্তমানে ৪২ জন সাংসদ রয়েছেন বাংলা থেকে। অর্থাৎ, মোট আসনে ৭.৭ শতাংশ। আসন পুনর্বিন্যাসের ফল ৬৪টি আসন হবে। অর্থাৎ, মোট আসনের ৭.৫ শতাংশ। ০.২ শতাংশ শক্তি কমবে বাংলার।
15
17
বিলটি নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ হল, এই সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য জনসংখ্যা-ভিত্তিক প্রকৃতি। সমালোচকদের যুক্তি, দক্ষিণের রাজ্যগুলি গত পাঁচ দশকে সফলভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে, নতুন বিল বাস্তবায়িত হলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পেতে পারে। অন্যদিকে, দ্রুত বৃদ্ধি হয়েছে উত্তরের রাজ্যগুলিতে। নতুন বিলের ফলে তাদের উল্লেখযোগ্য নতুন আসন সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
16
17
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সভাপতিত্বে বুধবারের এক বৈঠকে বিরোধী দলগুলি বিলটির বিরোধিতা করতে রাজি হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব উভয়েই এটিকে একটি ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এটিকে একটি ‘কূটনৈতিক পরিকল্পনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
17
17
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন প্রস্তাবিত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে রাজ্যব্যাপী বিক্ষোভের ঘোষণা করেছেন। তিনি এই সীমানা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাকে একটি ‘কালো আইন’ বলে অভিহিত করেছেন এবং রাজ্যের উদ্বেগ নিরসন না করে কেন্দ্র অগ্রসর হলে গুরুতর পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।