পৃথিবীতে এমন অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে, যেগুলি আমাদের হাজার হাজার বছর আগের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়। আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলে কুয়েভা দে লাস মানোস (Cueva de las Manos) বা ‘হাতের গুহা’ তেমনই একটি আশ্চর্য জায়গা।
2
10
এই গুহার দেওয়ালে রয়েছে প্রায় ৯ হাজার বছর আগের মানুষের রেখে যাওয়া হাজার হাজার হাতের ছাপ। আজও এই ছবিগুলি প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এগুলি দেখতে আসেন।
3
10
গুহাটির নামের অর্থই হল ‘হাতের গুহা’। কারণ এর পাথুরে দেওয়ালজুড়ে দেখা যায় অসংখ্য হাতের ছাপ। গবেষকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৭৩০০ সাল থেকে প্রায় কয়েক হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে এখানে ছবি আঁকা হয়েছিল। এই কাজ করেছিলেন সেই সময়ের শিকারি-সংগ্রাহক সম্প্রদায়ের মানুষরা, যারা ওই অঞ্চলে বসবাস করতেন।
4
10
সবচেয়ে মজার বিষয় হল, হাতের ছাপ তৈরির পদ্ধতি। প্রাচীন মানুষরা নিজেদের হাত গুহার দেওয়ালে চেপে ধরতেন। তারপর হাড় দিয়ে তৈরি সরু নলের সাহায্যে রং ছিটিয়ে দিতেন। হাত সরিয়ে নেওয়ার পর দেওয়ালে হাতের চারপাশে রঙের ছাপ থেকে যেত। ফলে হাতের আকারটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত। এই পদ্ধতিকে আজ ‘স্টেনসিল আর্ট’ বলা হয়। গুহার অধিকাংশ হাতের ছাপ বাঁ হাতের।
5
10
ইতিহাসবিদদের ধারণা, শিল্পীরা বাঁ হাত দেওয়ালে রেখে ডান হাতে রং ছিটিয়ে এই কাজ করতেন। শুধু হাতের ছাপই নয়, গুহার ভেতরে আরও অনেক ধরনের ছবি দেখা যায়। সেখানে শিকার করার দৃশ্য, বন্য প্রাণী, মানুষের অবয়ব এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশাও আঁকা রয়েছে। এসব ছবি থেকে জানা যায়, সেই সময়ের মানুষের জীবনের বড় অংশ জুড়েই ছিল শিকার ও প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম।
6
10
ছবিগুলিতে ব্যবহৃত রংও তৈরি হয়েছিল প্রাকৃতিক উপাদান থেকে। লোহা, ম্যাঙ্গানিজ এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ গুঁড়ো করে লাল, কালো, হলুদ ও সাদা রং তৈরি করা হয়েছিল। হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রংয়ের অনেকটাই এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
7
10
বর্তমানে এই গুহা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত। ১৯৯৯ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়। পর্যটকেরা নির্দিষ্ট গাইডের সঙ্গে গুহাটি ঘুরে দেখতে পারেন। গুহার আশপাশে রয়েছে সুন্দর পাহাড়ি উপত্যকা ও পিন্তুরাস নদীর ক্যানিয়ন, যা ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
8
10
কুয়েভা দে লাস মানোসে পৌঁছনোর জন্য কিছুটা পরিকল্পনার প্রয়োজন, তবে দুর্গম পথে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটিই এই ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ।
আপনি প্রথমে বিমানে বুয়েনস আইরেস গিয়ে সেখান থেকে প্যাটাগোনিয়ার দিকে যাত্রা করতে পারেন। রাজধানী থেকে আপনাকে যেতে হবে পেরিতো মোরেনো শহরে। এরপর বিখ্যাত 'ন্যাশনাল রুট ৪০' ধরে প্রায় ১১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই এই দর্শনীয় স্থানটিতে পৌঁছনো যায়। বিকল্প হিসেবে, আপনি প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট জনপদ 'বাজো কারাকোলেস' থেকেও এখানে আসতে পারেন।
9
10
যাত্রাপথের শেষ অংশটিতে আপনাকে মাটির ও নুড়িপাথরের তৈরি একটি রাস্তা দিয়ে যেতে হবে, যা স্থানীয়ভাবে 'রিপিও' নামে পরিচিত। রাস্তার উপরিভাগ বা অবস্থা সবসময় সমান থাকে না, তাই সাবধানে গাড়ি চালাতে হবে। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে যেন হঠাৎ রাস্তা পার হতে চাওয়া বন্যপ্রাণী যেমন শিয়াল বা গুয়ানাকো আপনার গাড়ির সামনে চলে না আসে।
10
10
এই গুহায় ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হল দক্ষিণ গোলার্ধের বসন্ত ও গ্রীষ্মকাল অর্থাৎ মোটামুটি অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এই সময় আবহাওয়া অনেক বেশি অনুকূল থাকে, ফলে বাইরে ঘুরে বেড়ানো ও সবকিছু উপভোগ করা অনেক আরামদায়ক হয়।