‘এক নম্বর পার্টি চিঠি’তে নিজেদের অভ্যন্তরের তীব্র সাংগঠনিক সংকট ও অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা আর রাখঢাক না রেখে কার্যত স্বীকার করে নিল সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের দলীয় দলিলে উঠে আসা তথ্য বলছে, নিচুতলার বুথ ও শাখা স্তর থেকে শুরু করে সদস্যপদের সামাজিক বিন্যাস—সর্বত্রই চরম দুর্বলতায় ভুগছে রাজ্যের প্রধান বাম দলটি।
2
12
নথির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের ৬৪.৯০ শতাংশ পার্টি শাখায় কোনও এজি (অক্সিলারি গ্রুপ) সদস্য নেই। পার্টির প্রাথমিক নিউক্লিয়াস বলে পরিচিত শাখাতেই যদি নতুন কর্মী তৈরির প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে পড়ে, তবে বুথ স্তরে সংগঠনের অস্তিত্ব টেকা যে অসম্ভব, তা মেনে নিচ্ছেন খোদ দলীয় নেতারাই। এক নেতার কথায় ধরা পড়েছে সেই নির্মম সত্যি—পার্টি ফেসবুকে বহাল তবিয়তে থাকলেও বুথে তাদের কোনও মুখ নেই।
3
12
এই সাংগঠনিক ক্ষয়ের পাশাপাশি আলিমুদ্দিনকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের তীব্র অনীহা। মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, দীপ্সিতা ধর, শতরূপ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্ত, ময়ূখ বিশ্বাস কিংবা সৃজনের মতো তরুণ মুখদের সামনের সারিতে এনে নির্বাচনে লড়ানো বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে তুলে আনা হলেও, তৃণমূল স্তরে তার কোনও ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
4
12
দলীয় নথির ৩ নম্বর পৃষ্ঠার তথ্য অনুযায়ী, সিপিএমের মোট সদস্য সংখ্যার মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সিদের অংশ নেমে এসেছে মাত্র ৪.৫৫ শতাংশে। অর্থাৎ, একশো জন সদস্যের মধ্যে পাঁচ জনও তরুণ নন। যে ‘জেন জি’ প্রজন্ম ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে চলেছে, তাদের মন ছুঁতে পুরোপুরি ব্যর্থ আলিমুদ্দিন।
5
12
নতুন প্রজন্মের বড় অংশ বাম জমানার বাংলাকে চোখেই দেখেনি, তাদের মানসিকতা বুঝতে প্রবীণ নেতারা হোঁচট খাচ্ছেন এবং পাড়ায় পাড়ায় বামপন্থী তরুণ মুখের অভাব সেই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে দলীয় নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়েছে, বয়সবিধি কার্যকর করার মতো দাওয়াই দিয়েও তারুণ্যের এই সংকট মেটানো যাচ্ছে না।
6
12
দলের রাজ্য নেতৃত্বের একাংশ আবার মনে করছেন, এই রোগ আজকের নয়; অন্তত কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে অহেতুক বাছবিচার করে বহু তরুণ-তরুণীকে সদস্যপদ না দেওয়ার চরম ভুলের খেসারতই আজ দিতে হচ্ছে দলকে।
7
12
সমস্যার এখানেই শেষ নয়। নিজেদের ‘সর্বহারা’ শ্রেণির দল বলে দাবি করলেও পার্টির সামাজিক বিন্যাসে তৈরি হয়েছে গভীর ভারসাম্যহীনতা। নেতৃত্ব ও সদস্যপদের সিংহভাগই দখল করে রেখেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। প্রকৃত খেতমজুর, দরিদ্র কৃষক, কারখানা শ্রমিক, তফসিলি জাতি, উপজাতি ও সংখ্যালঘুদের মতো সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ দল থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
8
12
সম্প্রতি ধর্মতলায় ডিওয়াইএফআই-এর ‘ইনকিলাব সমাবেশ’-এর ভিড় নেতৃত্বকে স্বস্তি দিলেও সেখানে মধ্যবিত্তের উপস্থিতিই ছিল বেশি। এই কারণে আগামী দু’বছরের মধ্যে খেতমজুর, গরিব কৃষক ও পিছিয়ে পড়া অংশ থেকে সদস্যপদের অনুপাত ৩০ শতাংশের বেশি করার কড়া লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে আলিমুদ্দিন।
9
12
মহিলাদের অংশগ্রহণের চিত্রটিও বেশ করুণ। একমাত্র দার্জিলিং জেলা বাদ দিলে বাকি রাজ্যজুড়ে মহিলাদের সংগঠনে যোগ্য স্থান দেওয়া হচ্ছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দলীয় পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে রাজ্যে সিপিএমের মহিলা সদস্যের হার ছিল ১০.৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১.৪ শতাংশে।
10
12
কাঠামোগত ঘাটতির পাশাপাশি সদস্যদের নীতি ও চারিত্রিক স্খলন নিয়েও বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে পার্টি চিঠিতে। দলের একাংশের বিরুদ্ধে সংগঠনের কাজ ফেলে নেটমাধ্যমে আত্মপ্রচারে মেতে থাকা এবং ‘অকমিউনিস্টসুলভ আচরণ’-এর অভিযোগ এনেছে আলিমুদ্দিন। সমাজমাধ্যমে পার্টির বিধিনিষেধ কার্যকর করতে জেলায় জেলায় একজন করে সার্বক্ষণিক কর্মী নিয়োগ করে নজরদারি চালানোর কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা রূপায়ণে চূড়ান্ত ঢিলেমি চলছে।
11
12
তবে কলকাতা ও হুগলির মতো দু-একটি জেলায় তরুণদের সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে তুলে আনার কিছুটা ইতিবাচক চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। দলের অন্দরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে শুরু করে দলীয় আদর্শবিরোধী আচরণ এখন আর শুধু ছাত্র-যুবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্রাক্তন সাংসদ বংশগোপাল চৌধুরীর বহিষ্কার বা প্রাক্তন মন্ত্রী সুশান্ত ঘোষকে জেলা সম্পাদকের পদ থেকে সরানোর মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে ক্ষয় ধরেছে দলের শীর্ষ স্তরেও।
12
12
বিধানসভায় শূন্য থেকে এক হলেও সামগ্রিক এই রোগ সারাতে এবং বুথ স্তরের ভূত তাড়াতে শাখা স্তরকে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে রাজ্য নেতৃত্ব। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, দৈনন্দিন রুটিরুজির আন্দোলন গড়ে তুলে এবং মধ্যবিত্তের ঘেরাটোপ ভেঙে সিপিএম কি পারবে আগামী তিন মাসে বুথ স্তরে আসল পুঁজি জোগাড় করতে?