বিশ্ব যখন হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা এবং তেলের দামের ওঠানামা নিয়ে ব্যস্ত, তখন নীরবে এক ভিন্ন পথে এগোচ্ছে চীন। মার্কিন-ইরান সংঘাতের প্রতিটি পর্বেই যখন বিশ্ববাজারে তেলের অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন বেইজিং এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের ঝুঁকিকে অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে পারে।
2
9
এই বৃহৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে স্টেট গ্রিড কর্পোরেশন অফ চায়না। যা ইতিমধ্যেই দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি এলাকা জুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এবং একশো কোটিরও বেশি মানুষকে পরিষেবা দেয়। এর পাশাপাশি চীনা সাউদার্ন পাওয়ার গ্রিডের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি হচ্ছে এক বিশাল জাতীয় ‘সুপারগ্রিড’, যা ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি হতে পারে।
3
9
এই সুপারগ্রিডের মূল লক্ষ্য হল দেশের অভ্যন্তরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকে শক্তিশালী করা, যাতে আমদানি করা তেল এবং সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। বিশেষ করে যেসব সমুদ্রপথ—যেমন হরমুজ প্রণালী—বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা চীনের অন্যতম লক্ষ্য।
4
9
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দ্রুত গতিতে তৈরি হচ্ছে ‘আল্ট্রা হাই ভোল্টেজ’ ট্রান্সমিশন লাইন। এই বিশেষ ধরনের বিদ্যুৎ পরিবহন ব্যবস্থা দেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের কয়লা, বায়ু ও সৌর শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে পূর্ব উপকূলের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করছে। ফলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্বেও কম ক্ষতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে।
5
9
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। চীন ধীরে ধীরে তার অর্থনীতিকে আরও বেশি বিদ্যুৎনির্ভর করে তুলছে—যেখানে ইলেকট্রিক যান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভারী শিল্প সবই এই শক্তিশালী গ্রিডের ওপর নির্ভর করবে।
6
9
একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৫৭৪ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করা হতে পারে। এই বিপুল অর্থ মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির মাধ্যমে বন্ড ইস্যু এবং স্বল্প সুদের ঋণের সাহায্যে তোলা হচ্ছে।
7
9
চীনের এই বিনিয়োগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, তারা স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। রাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন থাকায় এই সংস্থাগুলি দীর্ঘ সময় ধরে লাভের অপেক্ষা করতে পারে, যা বেসরকারি সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়।
8
9
এই সুপারগ্রিড তৈরি হলে শক্তির ব্যবহারও বাড়বে। বায়ু ও সৌর শক্তির মতো উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সহজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া যাবে, ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে।
9
9
সব মিলিয়ে, বিশ্ব যখন তেলের দামের ওঠানামা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ভুগছে, তখন চীন এক নতুন পথ তৈরি করছে—যেখানে শক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকবে দেশের ভেতরেই। ভবিষ্যতে এই কৌশলই বিশ্বের জ্বালানি রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।