একসময় মদ ও জুয়ার অন্ধকারে ডুবে ছিল কেরালার তিরুশূর জেলার মারোত্তিচাল গ্রাম। আজ সেই গ্রামই পরিচিত ভারতের ‘দাবার গ্রাম’ নামে।
2
15
এই অসাধারণ রূপান্তরের নেপথ্যে রয়েছেন একজন চা-দোকানি— চারালিয়িল উন্নিকৃষ্ণন।
3
15
একটা ঘুপচি ঘন অন্ধকার ঘর। একজন মানুষ তার সঙ্গে এক বোতল৷ কোথায় যাবে কী করবে কিছুই জানে না৷ এমন সময় একজন সেই বন্ধ দরজা খুলে এনে দিলেন আলো। উপহার দিলেন স্বচ্ছ পানীয় জল৷ দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকা মানুষ পেল আলো হাওয়া জল আর বাঁচার মন্ত্র৷
4
15
ছোট্ট গ্রাম। মাত্র ছয় হাজার মানুষের বাস৷ মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝে থেকেও মানুষজন তলিয়ে যাচ্ছিলেন অন্ধকারে। মদ্যপান ও জুয়ার চক্রে আটকে থাকা মানুষদের সুস্থ জীবনে ফেরালেন উন্নিকৃষ্ণন। মাদকাসক্ত মানুষদের জীবনে উন্নিকৃষ্ণন এক আলোর নাম৷
5
15
একটা সময় গ্রামের যে কোনও চায়ের দোকানে গেলেই দেখা যেত টেবিলে টেবিলে সিগারেটের প্যাকেট, ছাইদানি দু'জন মানুষ দাবা খেলছে আর একদল মানুষ সেই খেলা দেখতে মত্ত৷ ছোট থেকে বড় সকলেই এই অদ্ভুত নেশায় আসক্ত৷
6
15
সত্তর ও আশির দশকে মারোত্তিচালে চোলাই মদ তৈরি ছিল সাধারণ ব্যাপার, গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষই এই কাজে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তখনই উন্নিকৃষ্ণন তাঁদের শেখালেন জীবনে সম্মানের সঙ্গে ভালভাবে বাঁচার মন্ত্র৷
7
15
জুয়ার নেশায় ঘর সমাজ সংসার সব ভুলে গিয়েছিলেন কিছু মানুষ৷ চাষবাস ছিল প্রধান জীবিকা। মদ আর জুয়ার নেশায় সারাদিন নেশা করেই কেটে যেত৷ ফসল ফলানো ছেড়ে দিয়ে মদ খাওয়া আর অবৈধ মদ বিক্রি করা শুরু করেছিলেন৷ ঘরে অভাব নিত্য অশান্তি এমনকি সন্তানদের পরনে একটুকরো কাপড়ও জুটত না।
8
15
এই দুরবস্থা কাটাতে বাড়ির মহিলাদের সাহায্যে উন্নিকৃষ্ণন ‘মদ্য নিরোধন সমিতি’ গড়ে তোলেন। মহিলারা গোপনে খবর দিতেন বাড়ির পুরুষরা বাইরে বেরোলেই। আর মদ্য নিরোধন সমিতি আবগারি দপ্তরে জানাত।
9
15
আবগারি কর্মকর্তাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে দীর্ঘ সময় কাটত। সেই অবসরেই উন্নিকৃষ্ণন তাঁর সঙ্গীদের দাবা খেলা শেখাতে শুরু করেন।
10
15
দাবা খেলতে খেলতেই উন্নিকৃষ্ণন দিতেন জীবনের পাঠ৷ চা খাওয়ানোর অবসরে সুস্থ জীবনযাপনে ফেরার পথ বাতলে দিতেন উন্নিকৃষ্ণন৷ একবার শিখে ফেলার পর ‘নেশাগ্রস্তরা’ খুঁজে পান এক নতুন আনন্দ। তাঁর কথায়, “দাবাও এক ধরনের নেশা, তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যকর নেশা।”
11
15
ধীরে ধীরে মদের বোতলের টুংটাং শব্দ মিলিয়ে গিয়ে শোনা যেতে থাকে দাবার ঘুঁটির মৃদু আওয়াজ। উন্নিকৃষ্ণন প্রায় এক হাজার গ্রামবাসীকে এই খেলা শিখিয়েছেন।
12
15
আজ গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই অন্তত একজন দাবাড়ু রয়েছেন এবং প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ দাবা খেলেন। সবচেয়ে বেশি মানুষের একসঙ্গে দাবা খেলার একটি অনন্য এশীয় রেকর্ডও রয়েছে মারোত্তিচালের ঝুলিতে।
13
15
বিশ্ব দাবা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী গৌরীশঙ্কর জয়রাজ নামক এক ব্যক্তি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের শ্রেষ্ঠ ৬০০ জন দাবাড়ুর তালিকায় নাম লিখিয়েছেন৷ তাঁর মতোই বহু গ্রামবাসী দাবা খেলা শিখে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার লক্ষ্যে অবিচল৷
14
15
এখন গ্রামটির প্রতিটি স্কুলে ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যক্রমে দাবা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে৷ মারোত্তিচালের বেশ কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড় ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন৷
15
15
গ্রামবাসীদের কাছে উন্নিকৃষ্ণন আজ স্নেহের ‘মামন’ (মালয়ালম ভাষায় ‘কাকা’)। এক বাসিন্দার কথায়, “উনি আমাদের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমরা ওঁর কাছে চিরঋণী।”