কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানব সভ্যতার জন্য কতটা আশীর্বাদ আর কতটা অভিশাপ, সেই বিতর্ক বহুদিনের। তবে প্রযুক্তি যে খুব দ্রুত অপরাধী ও নজরদারির কারবারিদের হাতে চলে যাচ্ছে, তার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক।
2
9
সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের নতুন প্রতিবেদনে সংস্থাটি দেখিয়েছে, কীভাবে অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলোকে কাজে লাগিয়ে সাইবার হামলা, আন্তর্জাতিক স্তরে গুপ্তচরবৃত্তি এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। অ্যানথ্রপিকের তৈরি ক্লড মডেল ব্যবহার করে চালানো এই ধরনের বিপজ্জনক ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তথ্যপ্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে জোর শোরগোল শুরু হয়েছে।
3
9
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি এসেছে সাইবার হামলার ধরন পরিবর্তনের দিক থেকে। আগে হ্যাকাররা মূলত কোনও সাইবার হামলা চালানোর প্রাথমিক পর্যায়ে এআই-কে ব্যবহার করত—যেমন কোনও কোড লিখে নেওয়া, সিস্টেমে কোনও দুর্বলতা খোঁজা কিংবা বিশ্বাসযোগ্য ফিশিং ইমেল তৈরি করা। তবে নতুন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাইবার অপরাধীরা এখন এআই-কে শুধু পরামর্শদাতা হিসেবে রাখছে না, বরং স্বয়ংক্রিয় ‘এআই এজেন্ট’ হিসেবে কাজে নামিয়ে দিচ্ছে।
4
9
একাধিক এআই এজেন্টের সমন্বয়ে গঠিত সিস্টেম এখন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে সিস্টেমে অনুপ্রবেশ এবং সেখান থেকে তথ্য চুরি করার মতো দীর্ঘ ও জটিল কাজগুলো প্রায় মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেরা করে ফেলতে পারছে। মানুষ কেবল শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং শেষে ফলাফল খতিয়ে দেখছে। এর ফলে যেকোনও আক্রমণের গতি সাধারণের তুলনায় শতগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
5
9
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি অত্যন্ত সক্রিয় সাইবার গুপ্তচর গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড বিশদে তুলে ধরা হয়েছে, যাকে নিরাপত্তা গবেষকরা সংক্ষেপে জিটিজি-২০০০৬ বা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ‘মিডনাইট ব্লিজার্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই গোষ্ঠীটি ইউক্রেন, ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, কূটনৈতিক দপ্তর, সরকারি কার্যালয় এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।
6
9
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গুপ্তচরেরা প্রায় বিশটিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে সাইবার অভিযানের প্রতিটি ধাপে এআই সিস্টেম ব্যবহার করেছে। এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তারা এআই এজেন্টদের দায়িত্ব দিয়েছিল নজরদারি করার। অ্যান্টিভাইরাস বা নিরাপত্তা সফটওয়্যার তাদের পাঠানো ক্ষতিকর প্রোগ্রাম ধরে ফেললেই এআই মুহূর্তের মধ্যে সেই প্রোগ্রামটির কোড পরিবর্তন করে নতুন চেহারা দিত, যাতে তা ধরা না পড়ে। চুরি করা শত শত গিগাবাইট নথিপত্র দ্রুত গোছানো এবং বিশ্লেষণ করার কাজেও তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়েছে।
7
9
এই নতুন প্রবণতা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করছে। আগে কোনও জটিল ও নিখুঁত সাইবার আক্রমণ দেখে সহজেই বোঝা যেত যে এর পেছনে খুব বড় কোনও বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে। কিন্তু এখন সাধারণ প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যেকোনও ব্যক্তি বা অল্প বাজেটের অপরাধী দলও ইন্টারনেটে সহজলভ্য এআই টুল ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞদের মতো আক্রমণ চালিয়ে দিতে পারছে। অর্থাৎ সাইবার অপরাধের জগতে প্রবেশ করার প্রযুক্তিগত বাধাগুলো এআই-এর কারণে একরকম ভেঙে পড়ছে, যা আক্রমণকারীদের খরচ ও ঝুঁকি দুটোই কমিয়ে দিচ্ছে।
8
9
গুপ্তচরবৃত্তি ও হ্যাকিংয়ের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর গোপনে নজর রাখার ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এক ক্ষেত্রে ভুয়া ডেটিং অ্যাপের বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে মানুষকে সর্বস্বান্ত করার প্রমাণ মিলেছে, অন্য ক্ষেত্রে সরকারের সমালোচকদের শনাক্ত ও তাদের দৈনন্দিন গতিবিধির ওপর নজরদারি চালাতে বাণিজ্যিক স্পাইওয়্যার নির্মাতারা এআই মডেলের অপব্যবহার করেছে।
9
9
যদিও অ্যানথ্রপিক দাবি করেছে যে তারা প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং সরকারি তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নিয়েছে, তবুও এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সাইবার নিরাপত্তার সনাতনী প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। হামলাকারীরা যখন স্বয়ংক্রিয় এআই অস্ত্র হাতে নামছে, তখন প্রতিরক্ষা করতে গিয়েও মানুষকে এআই-এর শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, যা প্রযুক্তির এই লড়াইকে এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।