সিনেমা বা উপন্যাসের চিত্রনাট্যে হুট করে দৃশ্য বদলে যাওয়া বা ‘জাম্প কাট’ দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু বাস্তব জীবন যখন কোনও আগাম সংকেত ছাড়াই সেরকম একটা নির্মম ধাক্কা দেয়— তখন তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। টলিপাড়ার অকালপ্রয়াত, অসম্ভব প্রতিভাবান ও ‘পাগল’ স্বভাবের অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় -র প্রয়াণের পর কেটে গেছে চার-চারটি মাস। আর আজ, ২০২৬ সালের জুনে এসে আরও একটা ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের প্রিয় ‘দলের লোক’ রাহুলকে নিয়ে ফেসবুকে এক দীর্ঘ, হাড়হিম করা ও অশ্রুসিক্ত স্মৃতিচারণ করলেন প্রখ্যাত কবি ও গীতিকার শ্রীজাত।

ফুটবল সম্রাট মারাদোনার জন্য আর্জেন্তিনার অন্ধ ভক্ত হওয়া, ২০২২ সালের সেই রুদ্ধশ্বাস বিশ্বকাপ জয়, শ্রীজাতর মায়ের মৃত্যু এবং ঠিক তার দু’মাস পর খোদ রাহুলের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সেই অদ্ভুত সমাপতনের এক না-বলা কাহিনি উঠে এল শ্রীজাতর কলমে।

শ্রীজাত মনে করিয়েছেন ২০২২ সালের নভেম্বর মাসের এক সাতসকালের ঘটনা। হুট করেই রাহুলের ফোন— “শ্রীজাতদা, তোমার টি-শার্টের সাইজ কত?” সাতসকালে সাইজ কেন জানতে চাইছে, তা বুঝতে না পেরে শ্রীজাত যখন বললেন, “আমার মতো মানুষের কী আর হবে বলো, স্মল থেকে তো আর বেরোতে পারলাম না।” ফোনের ওপার থেকে রাহুলের উত্তেজিত উত্তর ছিল, “তুমি স্মল, আমি স্মল, গুরুও স্মল।”ঘণ্টা দেড়েক পর রাহুলের পাঠানো প্যাকেটে এসে হাজির হয়েছিল দুটি আনকোরা টি-শার্ট— একটি সাদা, একটি কালো। দুটিতেই মারাদোনার মুখ। ৮৬-র বিশ্বকাপ দেখার পর থেকে শ্রীজাত ও রাহুল দুজনেই ছিলেন আর্জেন্তিনার অন্ধ ভক্ত।

 

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্তিনা হেরে যাওয়ার পর শ্রীজাত যখন রাহুলকে ফোন করে ট্রোল হওয়ার কথা বলেছিলেন, তখন চার বছরের ছোট রাহুল পরম আত্মবিশ্বাসে বলেছিলেন, “ছাড়ো তো শ্রীজাতদা! ওসব হা-হা দু’দিনে শুকিয়ে যাবে। কাপ এবার আমাদের!” আর ডিসেম্বরের সেই মহাকাব্যিক ফাইনালে যখন ফ্রান্স দু’গোল শোধ করে কামব্যাক করছে, তখনও রাহুল অনবরত হোয়াটসঅ্যাপে অভয় দিচ্ছিলেন— “আমরাই জিতব!” টাইব্রেকার শেষে মেসির হাতে কাপ ওঠার পর ফোনের এপার-ওপার থেকে দুই বন্ধুর হাউহাউ করে কাঁদার সেই মুহূর্তটি আজ বড্ড একা করে দিয়েছে শ্রীজাতকে। এর আগে ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর মারাদোনার প্রয়াণের দিনও ফোন ধরে একইভাবে দুজনে ডুকরে কেঁদেছিলেন।

শ্রীজাতর মা আপাদমস্তক গানবাজনার মানুষ হলেও ওঁর চরম নেশা ছিল টেনিস দেখা। কট্টর ফেডেরার-ভক্ত ছিলেন তিনি। মায়ের এই টেনিসপ্রেমের কথা রাহুল জানতেন এবং খুব অবাক হতেন। চার বছর আগে মা যখন চলে গেলেন, শ্রীজাত শ্মশানে বসে আছেন দাহকাজের অপেক্ষায়। হঠাৎই সেখানে উদভ্রান্তের মতো এসে হাজির হলেন রাহুল। শুটিং ফ্লোর ফেলে ছুটে এসেছিলেন তিনি। চা খাওয়া শেষে শ্রীজাতকে শক্ত করে জাপটে ধরে রাহুল বলেছিলেন, “ফেডেরারের একজন সাচ্চা ফ্যান আজ চলে গেল। আমি আসি শ্রীজাতদা। দেখা হবে।”

শ্রীজাত লিখছেন, “তখনও আমি জানি না, সেই ও আমার দু’চোখ থেকে চিরতরে ফ্রেম আউট করছে। দেখা হল ঠিকই, দু’মাস পরে, আর ঠিক ওই শ্মশান চত্বররেই। কেবল এবার খবর পেয়ে ছুটে এসেছি আমি আর দূর্বা, রাহুল শুয়ে আছে ফুলে ডাকা, নিথর। কোনও বৈপ্লবিক চিত্রনাট্যকারও এরকম একটা জাম্প কাট লেখার আগে দশবার ভাববে, এবং শেষমেশ লিখবে না।”

যে শ্মশানে দাঁড়িয়ে দু’মাস আগে রাহুল শ্রীজাতকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, ঠিক দু’মাস পর সেই একই শ্মশানে বুকে আর্জেন্তিনার জার্সি জড়ানো নিথর রাহুলকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরতে হয়েছিল শ্রীজাতকে।

শ্রীজাতর স্ত্রী দূর্বাকে নিজের দিদির মতো ভালবাসতেন রাহুল। মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আর পাঁচ দিন আগে গভীর রাত দেড়টায় রাহুল শেষ দু'টি মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। পাঁচ দিন আগে শ্রীজাতর গাড়ি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে উদ্বেগে রাহুল লিখেছিলেন— “কী গো, ঠিক আছ তো? মরে যাব তো তোমার কিছু হলে!” আর তিন দিন আগের মেসেজে ছিল আড্ডার নিমন্ত্রণ ও অভিমান— “২১ তারিখ দূর্বা’দি কিন্তু আসবে বলে দিয়েছে। তুমি আসবে তো? টিকিট রাখছি।”

তিন দিন পর থেকেই শুরু হতে চলেছে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ। লিওনেল মেসি ওঁর কেরিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন। কিন্তু এবার আর ফোনের ওপারে সেই উত্তেজিত, পাগল ছেলেটা নেই।

শ্রীজাত ওঁর পোস্টের শেষে এক চরম শূন্যতা উগরে দিয়ে লিখেছেন,“তোমার দেওয়া টি-শার্ট দুটো পাট ক’রে আলমারিতে তোলা আছে, তোলাই থাকবে। জিতলেও যখন কান্না, আর হারলেও যখন কান্নাই, তখন আর আমার জেতা-হারায় মন নেই। ১৯ জুলাই অবধি যদি বেঁচে থাকি, মেসি’র শেষবারের আর্জেন্তিনা যদি ফাইনালে পৌঁছয়, আমি জানি না, সত্যিই জানি না, সে ম্যাচ দেখব কি না। হারলে যদি কান্না উঠে আসে? জিতলে যদি চোখ ভিজে যায়? তখন আমি কাকে ফোন ক’রে কাঁদব, রাহুল?”

শ্রীজাতর এই ফেসবুক পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়েছে নেটপাড়ায়। টলিপাড়ার অনেক তারকাই এই পোস্টের নিচে মন্তব্য করে রাহুলের স্মৃতিতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। খেলার মাঠের জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে এক বন্ধুর জন্য আর এক বন্ধুর এই নীরব হাহাকার আজ আপামর বাঙালিকে কাঁদিয়ে গেল।