খেলার মাঠের লড়াইয়ে আসলে কতটা রক্ত লেগে থাকে? হার-জিতের অঙ্কের আড়ালে কতদূর পর্যন্ত চলতে থাকে অন্য কোনও হিসেব? শেষমেশ জয় যদি আসে হাতের মুঠোয়, তাতে কি শুধুই আনন্দ মাখা থাকে?
বক্সিং রিং ঘিরে অন্য স্বাদের এক স্পোর্টস ড্রামায় প্রদীপের নীচের সেই অন্ধকারগুলোকেই হাতড়ে দেখল নেটফ্লিক্সের নতুন ওয়েব সিরিজ ‘গ্লোরি’। চেনা ছকের স্পোর্টস ড্রামার পথ ধরে আন্ডারডগের জিতে যাওয়ার গৌরব নয়, যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মিশে রইল ময়দানের বাইরের তুমুল রেষারেষি, পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের, অপরাধ আর প্রতিশোধের গল্প। আলোর বদলে কালোর গল্প বলতে এসে তাই হাড়হিম করা নৃশংসতাকেই তুরুপের তাস করে রাখলেন পরিচালক জুটি করণ অংশুমান ও কনিষ্ক ভার্মা।
গল্পে বক্সিং রিংয়ে হরিয়ানার প্রবল পুরুষালি পরাক্রমকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এগিয়ে নিয়ে চলে সেখানকার দুই নামী বক্সিং প্রশিক্ষণ ক্লাবের রেষারেষি। দুই ক্লাবের দুই কোচ, রঘুবীর (সুবিন্দর ভিকি) এবং বিজু (আশুতোষ রানা)-র লক্ষ্য একটাই। নিজেদের ক্লাবের বক্সারকে অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো। রঘুবীরের বাবা গিয়েছিলেন অলিম্পিকে, সোনা জিততে পারেননি। সেই আফশোস তাদের বংশকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে বরাবর। আর তাই যে কোনও মূল্যে অধরা সেই জয়গৌরব ছিনিয়ে আনাই রঘুবীরের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সে নিজের ছেলে কিংবা ছাত্র, যার হাত ধরেই আসুক।
সিরিজের শুরুতেই খুন হয়ে যায় অলিম্পিকের দৌড়ে থাকা রঘুবীরের প্রিয় শিষ্য নিহাল এবং তার প্রেমিকা, রঘুবীরেরই কন্যা গুড়িয়া (জন্নত জুবের রহমানি)। সেই মৃত্যু বাড়িতে ফিরিয়ে আনে বাবার কারণেই ঘরছাড়া দুই ছেলে দেবেন্দর ওরফে দেব (দিব্যেন্দু শর্মা) এবং রবীন্দর ওরফে রবি-কে (পুলকিত সম্রাট)। আদরের বোনের মৃত্যুর কারণ খুঁজে বার করে বদলা নেওয়াটাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এ কাজে তাদের সঙ্গী হয় ছোটবেলার বন্ধু, ইনস্পেক্টর অরবিন্দ (বিশাল বশিষ্ঠ) এবং দিল্লি থেকে আসা সাংবাদিক জয়না(সায়নী গুপ্ত)। পাশে থাকে অরবিন্দর স্ত্রী ভারতীও (কাশ্মীরা পরদেশি)। বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক সন্দেহভাজনের নাম। চলতে থাকে শাস্তিবিধান আর প্রতিহিংসার পালা।
কিন্তু কেন খুন হতে হল গুড়িয়া আর নিহালকে? কে আছে এই নৃশংস হত্যার নেপথ্যে? আসল সত্যির সন্ধান পেয়ে আততায়ী পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কি দুই ভাই? সেই সব প্রশ্নেই ঘুরপাক খেয়েছে সাত পর্বের এই সিরিজ।
ঘাম-রক্ত মাখা পরাক্রমের এই দুনিয়া যে শুধু বক্সিং রিংকেই ঘিরে রাখে, তেমনটা তো নয়। তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখে পেশীশক্তির হিংস্রতা আর নৃশংস অপরাধ। এ গল্প তারও। আর তাই সিরিজ জুড়ে যাকে বলে ‘র অ্যান্ড গ্রিটি’ হয়ে ধরা দেয় একের পর এক পর্ব। নৃশংসতার বহর দেখে, শাস্তি কিংবা হত্যার নৃশংসতা দেখে শিউড়ে উঠতে হয়। তার মধ্যেই এক পারিবারিক মান-অভিমান-দ্বন্দ্ব-অপমানের কাহিনিকেও সমান মুন্সিয়ানায় বুনে দিয়েছেন পরিচালক-কাহিনিকারেরা। সেই গল্প চোখ টানে অভিনয়ের বলিষ্ঠতায়। একইসঙ্গে সাবপ্লট হয়ে ধরা দেয় লিঙ্গবৈষম্য, প্রশাসন থেকে খেলার দুনিয়ার হরেক দুর্নীতি, পরকীয়া, বিয়ের টোপ দিয়ে যৌনব্যবসার মতো সামাজিক সমস্যাও। সেই সাবপ্লট আর তার চরিত্রদের ভিড় অবশ্য নিঃসন্দেহে খানিকটা বাড়তি ওজন জুড়ে দেয় সিরিজে। ফলে আরও কিছুটা জটিল হয়ে গতি কমে যায় গল্পের। আর খামতির খাতায় যে জায়গাটা সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তা হল প্রত্যাশার পারদ ধাপে ধাপে অনেকটা চড়িয়ে দেওয়ায় শেষপাতের ট্যুইস্টে যেন মন ভরে না। বরং বলা ভাল, কিছুটা যেন আশাহতই করে ক্লাইম্যাক্স।
তবে খামতিগুলো মিটিয়ে দিয়েছে অভিনয়। বাবার মনের মতো বক্সার হতে না পারা থেকে দুরন্ত অভিমানের জের বয়ে বেড়ানো দেবেন্দরকে, তার মনের দোলাচলগুলোকে ভীষণ রকম জীবন্ত করে তুলেছেন দিব্যেন্দু। তারই উল্টোপিঠে এক অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায় নিয়ে রিং থেকে সরে দাঁড়ানো রবীন্দরের নতুন করে বক্সিংয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার সফরটাকে সমান দক্ষতায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন পুলকিতও। অলিম্পিকের মেডেলকেই জীবনের সারসত্য বলে ধরে নেওয়া ‘কোচ স্যর’কে, তার কাঠিন্য কিংবা আশাভঙ্গের যন্ত্রণাকে যত্নে ফুটিয়েছেন সুবিন্দর। উপকারী পুলিশ-বন্ধু হিসেবে ভাল লাগে বিশালকে। অন্যদিকে গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে ভারতীকে নজরকাড়া করে তুলতে কাশ্মীরাও কম যাননি। ছোট্ট ছোট্ট পরিসরে খুব কিছু করার ছিল না আশুতোষ, সায়নী, জন্নতদের। তা সত্ত্বেও চোখ টানার দৌড়ে পিছিয়ে থাকেননি কেউই।
অভিনয়ের পাশাপাশি হরিয়ানার পথঘাট, চরিত্রদের চেহারা-চালচলন, হিংস্র অপরাধের গা শিউরে দেওয়া সিনেম্যাটোগ্রাফি আর টানটান এডিটিংয়ে অনেকটাই নম্বর আদায় করে নিতে পারে এ সিরিজ। যদিও বক্সিং রিং বা প্রশিক্ষণের দৃশ্যগুলো বাস্তবের নিরিখে একটু কমজোরি বটে।
তবে এ ধরনের সিরিজগুলো, যাতে গল্প হাঁটে নৃশংসতার পথ ধরে, সেখানে ডিটেলিংয়ের দিকটায় একটু সচেতন হওয়ার সময় বোধহয় এসেছে। বাস্তবে বাড়তে থাকা অপরাধপ্রবণতা বা নৃশংসতাকে উস্কে দিতে পারে, এমন বিশদ দৃশ্যগুলোকে একটু কাটছাঁট করে দিলে হয়তো সমাজেরই একটু উপকার হত। তাই না?















