বাঙালি চিরকালই শিল্পীর মৃত্যুর পর ওঁর চূড়ান্ত কদর করতে ভালবাসে— এই চেনা অপবাদ আরও একবার সত্যি প্রমাণিত হলো টলিপাড়ায়। আজ থেকে বছর চারেক আগে, ২০২২ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির নেপথ্যের কঠিন লড়াই নিয়ে তৈরি পরিচালক অনীক দত্ত -র কালজয়ী ছবি ‘অপরাজিত’ বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল। দেশ-বিদেশে কুড়িয়েছিল সমালোচকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তৎকালীন সময়ে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রেক্ষাগৃহ নন্দন-এর পর্দায় ব্রাত্যই থেকে গিয়েছিল এই ছবি। সিনেমাটি নন্দনে স্লট পায়নি। তৎকালীন রাজ্য সরকারের অঙ্গুলিহেলনে নন্দনে এ ছবি ঠাঁই পায়নি। আপামর ছবিপ্রেমী দর্শকের অনুরোধেও কর্ণপাত করেনি সরকার।
আজ পরিচালক অনীক দত্ত প্রয়াত। আর ওঁর মৃত্যুর পর, ওঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে আগামী ৫ জুন থেকে ৭ জুন নন্দন-১ প্রেক্ষাগৃহে ‘অপরাজিত’ ছবির বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। আজ, বুধবার থেকেই এই বিশেষ শো-এর টিকিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ছবির প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসান।
পরিচালক অনীক দত্তর সাথে নন্দন কর্তৃপক্ষের সংঘাতের ইতিহাস অবশ্য বেশ পুরোনো। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওঁর রাজনৈতিক শ্লেষে ভরা ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’ মুক্তির প্রথম দিনেই নন্দনের স্ক্রিন থেকে আচমকা গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিবাদের জেরে ছবিটিকে এক প্রকার ‘অঘোষিত বয়কট’ বা সেন্সরশিপের মুখে পড়তে হয়েছিল, যা নিয়ে সেই সময় তীব্র বিতর্ক দানা বাঁধে বুদ্ধিজীবী মহলে।
যাঁকে জীবদ্দশায় নন্দনের দরজায় বারবার ধাক্কা খেতে হয়েছিল, ওঁর মৃত্যুর পর ওঁর মরদেহ শেষ শ্রদ্ধার জন্য শায়িত রাখা হয়েছিল এই নন্দন চত্বরেই। আর এবার ওঁর সেরা সৃষ্টি ‘অপরাজিত’ সগৌরবে ফিরছে নন্দনের রুপোলী পর্দায়। এই ঐতিহাসিক ও কাব্যিক প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই তাই গভীর প্রতীকী এবং আবেগঘন বলে বর্ণনা করছেন।
‘অপরাজিত’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের আদলে তৈরি ‘অপরাজিত রায়’ (অপু)-এর চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন অভিনেতা জিতু কামাল । অনীক দত্তর শেষ ছবি নন্দনে ফেরানোর পেছনে ওঁর এক মস্ত বড় ভূমিকা রয়েছে। জিতু কামাল এ প্রসঙ্গে বলেছেন,“আমি ব্যক্তিগতভাবে রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম এবং নন্দনে অনীকদার এই ছবিটির স্ক্রিনিংয়ের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। খুব কম সময়ের মধ্যেই ওনাদের তরফ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। এই সিদ্ধান্তটা যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনই আমাদের পুরো টিমের কাছে ভীষণ অর্থবহ। স্ক্রিনিংয়ের সময় আমরা সবাই মিলে অনীকদাকে স্মরণ করব। আশা করি দর্শকরা থিয়েটারে এসে ছবিটির গুণগত মান বিচার করবেন।”
ওপার বাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকেও এই খবর শোনার পর নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ওখানকার জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী । তিনি ‘অপরাজিত’ টিমের কাছে নিজের শুভকামনা পাঠিয়েছেন।
বাঙালি সিনেমা এবং সংস্কৃতির প্রধান পীঠস্থান নন্দনে ‘অপরাজিত’-র এই স্ক্রিনিং আসলে প্রয়াত অনীক দত্তর কাজের প্রতি এক মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি । ৩ দিনের এই বিশেষ প্রদর্শনীতে টলিপাড়ার বহু তারকার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। যারা প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মিস করেছিলেন, তাঁদের জন্য বড়পর্দায় সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী ছবির মেকিং দেখার এটি এক সুবর্ণ সুযোগ।

এ প্রসঙ্গে আজকাল ডট ইন-এর কাছে নিজের মনের কথা ভাগ করে নিলেন অভিনেতা দেবাশিষ রায়-ও। যাঁকে ‘অপরাজিত’ ছবিতে সত্যজিতের ছবির চিত্রগ্রাহক সুব্রত-মিত্র র চরিত্রে দেখা গিয়েছিল। তাঁর কথায়, “শেষমেশ নন্দনে অপরাজিত মুক্তি পাচ্ছে যা যতটা আনন্দের একধারে, অন্যদিকে ততটাই দুঃখের। অনীকদা ভীষণভাবে চেয়েছিলেন এই ছবিটি যেন নন্দনে মুক্তি পায়। তার নেপথ্যের কারণ কিন্তু শুধুই এই প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে কিংবা বাঙালি সংস্কৃতির গর্বের জায়গা বলে নয়। নন্দনে অপরাজিত ব্রাত্য হয়েছিল বলে যে এই ছবির খুব আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল, এমনটি মোটেও নয়। আসলে, অনীকদা চেয়েছিলেন খুব করে স্কুলকলেজে পড়া ছাত্রছাত্রী যাঁদের পকেটে পয়সা কম, যেসব ছবিপ্রেমী মানুষের পকেটের জোর কম তাঁরা যেন নন্দনে সবার সঙ্গে বসে এই ছবিটি উপভোগ করতে পারেন, খুব অল্প তাকে। কিন্তু তা হতে দেয়নি তৎকালীন সরকার। খুব কষ্ট পেয়েছিলেন অনীকদা। খুব মনে পড়ছে, অনীকদাকে সেই সময় পরিচালক তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, ‘আপনি কী ছবি বানিয়েছেন তার গুরুত্ব মানুষ বিশ্বে আরও ১০ বছর পর!’ আমার বিশ্বাস অনীকদা সেদিন কোথাও থেকে দেখবেন যে তিনি জিতে গেলেন। দেরি হল বটে, তবে তিনি-ই জিতলেন। তাঁর কাজ জিতল। আগামী ৫ জুন আমরা যাঁরা এই ছবির সঙ্গে জড়িয়ে, তাঁরা প্রত্যেকে যাব নন্দনে। খুব মিস করছি অনীকদা-কে। আমাদের ক্যাপ্টেন-কে। আর শেষ করার আগে বলি, এটাই জীবন। যাঁরা এই অন্যায়টা করেছিলেন সেদিন অনীকদার সঙ্গে, আজ তাঁদের অস্তিত্বই প্রায় মুছে যেতে চলেছে এই রাজ্য থেকেই। অনীকদা আপনি দেখছেন তো?”
















