মাঠের ৯০ মিনিটের ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয় দিনের পর দিন মানসিক চাপ, কঠোর অনুশীলন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হারিয়ে। ইস্টবেঙ্গলে সদ্য সই করা ক্রিস ইকোনোমিডিসও এমনই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে কথা তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন।
2
11
২০১৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি এক সপ্তাহ ইকোনোমিডিসের জন্য ছিল জীবনের অন্যতম কঠিন সময়। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে তাঁর বাবা-মা দুই সপ্তাহের জন্য ইতালির শহর সালের্নোতে ছেলেকে দেখতে এসেছিলেন। তখন ইকোনোমিডিস সিরি ‘বি’-এর ক্লাব সালের্নিতানার হয়ে খেলছেন। লাজিও থেকে লোনে গিয়েছিলেন সালের্নিতানায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাবা-মা এসে পৌঁছনোর পরও তাঁদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ সীমাবদ্ধ ছিল শুধু ফোনকলেই।
3
11
কারণ, ক্যাগলিয়ারির বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে হারের পর সালের্নিতানা ক্লাব পুরো দলকে কঠোর শাস্তি হিসেবে এক সপ্তাহের জন্য আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আটকে রাখে। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ফিরিয়ে এনে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেখানে অতিরিক্ত অনুশীলন, একই কমপ্লেক্সে থাকা, খাওয়া ও ঘুম, সবকিছুই করতে হয়। পরবর্তী ম্যাচ না হওয়া পর্যন্ত কারও বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। এমনকি অস্ট্রেলিয়া থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আসা পরিবারের সদস্যদেরও ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
4
11
ইকোনোমিডিস স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “আমার বাবা-মা আমাকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু আমরা কাগলিয়ারির কাছে হেরে যেতেই আমাদের এক সপ্তাহের জন্য আবাসিকে থাকতে হয়। ফলে তাঁদের সফরের অর্ধেক সময়ই আমি তাঁদের সঙ্গে কাটাতে পারিনি। তখন খুব কষ্ট লেগেছিল, যদিও এখন ঘটনাটা মনে করে আমরা হাসি। সত্যি বলতে, ব্যাপারটা ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য।”
5
11
এই কঠোর শাস্তি তরুণ ইকোনোমিডিসকে মানসিকভাবে আঘাত করলেও ক্লাবের কাছে সেটাই ছিল শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপায়। শেষ পর্যন্ত তারা মরশুমের শেষ ম্যাচে কোমোকে ১-০ গোলে হারিয়ে অবনমন এড়াতে সক্ষম হয়। ইতালিয়ান ফুটবলে এমন শাস্তিমূলক ক্যাম্প ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা, যার অভিজ্ঞতা ইকোনোমিডিসকে একাধিকবার নিতে হয়েছে।
6
11
তিনি বলেছিলেন, “ইতালিতে সবকিছুই আলাদা। সেখানে ফুটবল একটা ধর্মের মতো। মানুষ প্রতিটি ফলাফলকে ব্যক্তিগতভাবে নেয়। লাজিওর হয়ে খেলতে গিয়েও এমন হয়েছে। হারার পর আমাদের পরবর্তী ম্যাচ পর্যন্ত ট্রেনিং গ্রাউন্ড ছাড়তে দেওয়া হয়নি। জিতলে তবেই বাড়ি ফিরতে পারতাম।”
7
11
লাজিওর যুব দল থেকে মূল দলে উন্নীত হওয়ার পরই তিনি ইতালিয়ান ফুটবলের কঠিন বাস্তবতা বুঝতে শুরু করেন। প্রাক্তন কোচ স্তেফানো পিওলির অধীনে কিয়েভো ভেরোনার বিরুদ্ধে ৪-০ গোলে হারের স্মৃতি স্পষ্ট তাঁর মনে স্পষ্ট।
8
11
তিনি বলেছিলেন, “ওই ম্যাচে আমরা প্রথমার্ধেই ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত ৪-০ গোলে হারি। স্টেডিয়াম থেকে ফিরে দেখি প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষুব্ধ সমর্থক ট্রেনিং গ্রাউন্ডের সামনে অপেক্ষা করছে। তাই আমাদের পিছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। এরপর পরের জয় না আসা পর্যন্ত সেখানেই থাকতে হয়েছিল।”এই ধরনের শাস্তি তিন-চার বার পেয়েছেন তিনি।
9
11
ইতালিয়ান ফুটবলের এই কঠোর, আবেগপ্রবণ পরিবেশ একদিকে যেমন চাপের, অন্যদিকে সাফল্যের মুহূর্তগুলোও ছিল অবিস্মরণীয়। ইকোনোমিডিস বলেন, “একটা ম্যাচ জিতলেই সমর্থকেরা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে। শত শত মানুষ ছবি তুলতে আসবে, গান গাইবে, এমনকি অনুশীলনের সময়ও উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে দেবে।”
10
11
তবে দীর্ঘ ছয় বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে এসে ওয়েস্টার্ন সিডনি ওয়ান্ডারার্সে যোগ দেওয়ার পর তিনি যেন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছিলেন। দেশে ফেরার মাত্র ১২ ঘণ্টা পরই তিনি অনুভব করেছিলেন পরিবারের কাছে থাকার মানসিক শান্তি।
11
11
ক্রিস ইকোনোমিডিসের এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়। এটি ইতালিয়ান ফুটবলের কঠোর সংস্কৃতি, সমর্থকদের আবেগ এবং পেশাদার ফুটবলের নির্মম বাস্তবের এক জীবন্ত চিত্র।