বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবিখ্যাত পরিচালক অনীক দত্ত-র অস্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি সিনেপ্রেমীরা। সম্প্রতি গত ২৭ মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রতিভাবান পরিচালক। ওঁর চলে যাওয়ার পর যখন চারিদিকে শোক আর সংবাদমাধ্যমের আলোড়ন, ঠিক তখনই নিজের নীরবতা ভাঙলেন অনীক দত্তর কাকা তথা কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা বিমল রায়ের পুত্র জয় বিমল রায়।
এতদিন কিছু না লিখলেও, অবশেষে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ভাইপো ‘বুবা’ (অনীক দত্তর ডাকনাম)-র সঙ্গে কাটানো শৈশব, ওঁর একাকীত্ব এবং মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগের শেষ সাক্ষাতের এক আবেগঘন ও হাড়হিম করা বিবরণ তুলে ধরেছেন জয় বিমল রায়।
নিজের লেখার শুরুতেই জয় বিমল রায় সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের মানসিকতার ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, “আমার ভাইপো বুবা (অনীক দত্ত)-র বিষয়ে এতদিন কিছু লিখতে আমি দ্বিধাবোধ করছিলাম। কারণ ওঁর মৃত্যুটা একটা ‘মিডিয়া সার্কাস’-এ পরিণত হয়েছে। আমার ভয় ছিল, আমি যদি এখন কিছু লিখি, তবে লোকে হয়তো ভাববে আমি ওঁর সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে সস্তা প্রচার বা ফায়দা তোলার চেষ্টা করছি। কিন্তু আবার কিছু না বলাটাও অদ্ভুত দেখাত, বা যারা আমাদের এই পারিবারিক যোগসূত্রটা জানেন, তাঁদের কাছে মনে হতো আমি হয়তো ওঁর প্রতি উদাসীন।”

অনীক দত্তর সঙ্গে তাঁর পরিবারের সম্পর্ক ঠিক কেমন ছিল, তা জানাতে গিয়ে জয় লেখেন, বুবা ছিলেন বিমল রায়ের বড় দাদা অনিল রায়ের নাতি। অনিল রায় স্কটল্যান্ডের ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং ব্যারাকপুরের একটি ব্রিটিশ কোম্পানি ‘এম্পায়ার জুট মিল’-এ চাকরি করতেন। মিল কম্পাউন্ডের ভেতরে ওঁর বিশাল ফ্ল্যাটটি বাকি পরিবারের কাছে ছিল একটা হলিডে হোমের মতো। সবাই সেখানে উইকএন্ড কাটাতে যেতেন।
জয় সেই সময়ের এক মজাদার ও বাস্তব স্মৃতি হাতড়ে লেখেন, “ওই মস্ত ফ্ল্যাটে বাথরুম ছিল মাত্র একটি। স্বাভাবিকভাবেই সময় বাঁচাতে একদিন আমার খুড়তুতো ভাই পিপলু, বুবা আর আমাকে একসঙ্গে জোর করে ওই একটা বাথরুমে স্নান করার জন্য ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ব্যস! বুবা তো কান্নায় ভেঙে পড়ল। কোনও কিছুতেই ও আমাদের সাথে স্নান করতে রাজি হলো না। বুবার সঙ্গে এটাই আমার জীবনের প্রথম স্মৃতি। খুব একটা শোভনীয় স্মৃতি হয়তো নয়, কিন্তু এটাই খাঁটি এবং অলঙ্কৃতহীন সত্য।”
বয়সের ৫ বছরের ব্যবধান থাকায় দু’জন দুই আলাদা শহরে বড় হলেও একই ধরনের পরিবেশ পেয়েছিলেন। তবে অনীকের প্রথম ভাষা ছিল বাংলা, যার ওপর ওঁর অসাধারণ দখল ছিল। আর সেই দখলই ওঁর প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এ ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল। মাঝে বেশ কিছু বছর অনীক একটু আত্মকেন্দ্রিক ও নিজের জগতে হারিয়ে থাকলেও, কলকাতার হিন্দুস্তান পার্কে ওঁর চমৎকার ডুপ্লেক্স বাড়িটি হওয়ার পর সব বদলে যায়।
জয় বিমল রায় সেই সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করে লেখেন, “ততদিনে বুবা চলচ্চিত্র জগতে এবং সমাজে এক বিশাল নামী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের পুরো পরিবারের কাছে অত্যন্ত গর্বের ছিল। ওঁর ওই নতুন বাড়িটিই খুব দ্রুত আমাদের পারিবারিক আড্ডার সদর দফতর বা হেডকোয়ার্টার হয়ে উঠল। সিনেমা, সাহিত্য, ভালবাসা, জীবন আর আত্মা নিয়ে বুবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে আলোচনা করত। ম্যাল্ট হুইস্কির সুগন্ধ আর সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরা ওই গভীর রাতের আড্ডাগুলোর মধ্যে একটা অন্যরকম আভিজাত্য ছিল। আর বুবার মার্জিত স্ত্রী তুতুল (সন্ধি দত্ত) সবসময় ছিলেন আতিথেয়তার প্রতীক।”
ধীরে ধীরে অনীক দত্ত সিওপিডি (COPD)-তে আক্রান্ত হন এবং হাসপাতাল ও বাড়ির মধ্যে ওঁর জীবন যাতায়াত করতে শুরু করে। জয় বিমল রায় জানান, তিনি শেষবার অনীককে দেখতে গিয়েছিলেন গত ১১ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে। সেই রাতের ভয়ানক ও যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জয় লেখেন, “রাত তখন পৌনে ন'টা। পরিচারিকা দরজাটা সামান্য ফাঁক করে এক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত চূড়ান্ত সুরে বলল— ‘দাদা ঘুমাচ্ছেন’। আমি ওঁর কথা না শুনেই ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। বললাম, মাত্র পৌনে ন'টা বাজে, ও এখন ঘুমাতেই পারে না। বুবার ঘরটা তখন আধা-অন্ধকার ছিল। ও খাটের কোণায় বসে ওঁর বাই-প্যাপ (Bi-pap) মেশিনের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে দেখে ও চমকে উঠলেও, পরে ওঁর সেই সুন্দর চেনা হাসিটি হাসল— যে হাসি ওঁর সংস্পর্শে আসা যে কোনও মানুষকে গলিয়ে দিতে পারত।”
জয় অনীকের জন্য এক বোতল হুইস্কি নিয়ে গিয়েছিলেন। তা দেখে অনীক জিজ্ঞেস করেন, “এটা কি আমার জন্য? ডাক্তার তো আমাকে খেতে বারণ করেছেন।” জয় একটু বিরক্ত হয়ে রসিকতা করে বলেন, ও নিজেও ওষুধ খাচ্ছেন তাও পরিমিত মদ্যপান করেন, এতে ক্ষতি হবে না। কিন্তু অনীকের চোখে ছিল গভীর সংশয়।
জয় আরও লেখেন -“ওঁর একাকীত্বটা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে আমার মনটা কেঁদে উঠেছিল। আমি ওকে বললাম, তোমার এভাবে একা থাকা উচিত নয়। ও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল— ‘আমার স্কুলের বন্ধুরা মাঝে মাঝে আসে’। শুনে ভাল লাগল। আবার একটু নীরবতা। তারপর ও আমাকে হুট করে একটা ভারী প্রশ্ন করল— ‘আমাকে কেমন দেখতে লাগছে?’ প্রশ্নটা বড্ড কঠিন ছিল। ধবধবে সাদা পোশাকে ওঁর শরীরটা জীর্ণ, শীর্ণ এবং মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাশে লাগছিল। কিন্তু আমি মুখে ওঁর সামনে সেই সত্যিটা বলতে পারলাম না, ওঁর সামনে একটা মিথ্যে বললাম যে ওকে ভাল লাগছে দেখতে। শুনে ও একটু খুশি হল। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম নতুন কিছু লিখছ কি না, ও বিষণ্ণভাবে মাথা নেড়ে বলল— ‘আমি কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছি না’। আমি খুব অশান্ত মন নিয়ে সেদিন ওঁর বাড়ি থেকে ফিরেছিলাম এবং ভাবছিলাম এভাবে আর কতদিন চলবে।”
মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগেও অনীক দত্ত ফোন করেছিলেন জয় বিমল রায়কে। ওঁর গলার আওয়াজ তখন কিছুটা জড়িয়ে যাচ্ছিল। অনীক অনুরোধ করেছিলেন ওঁর পছন্দের এক তরুণী অভিনেত্রী এই মুহূর্তে বোম্বেতে আছেন, জয় যেন ওকে নিজের বাড়িতে ডেকে নেন। একইসঙ্গে অনীক জানিয়েছিলেন যে তিনি একটা নতুন কাজ শুরু করেছেন। শুনে জয় অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।
কিন্তু সেই আনন্দের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েকদিন। জয় ওঁর লেখার শেষে অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে লেখেন, “গত ২৭ মে দুপুর ২টো নাগাদ কলকাতার এক ভাইঝির ফোন এল। ও বলল— ‘একটা খুব খারাপ খবর আছে, অনীকদা আর নেই’। প্রথমে আমি বুঝতেই পারিনি ও কার কথা বলছে। তারপর ও বলল— ‘বুবা’। মুহূর্তের মধ্যে আমার চেনা পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল। আর সেই ওলটপালট হয়ে যাওয়া দুনিয়াটা এখনও আর সোজা হতে পারল না।”















