সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে দুনিয়ায় আজ ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ শব্দটাই যেন নতুন ক্ষমতার নাম। ভিউ, লাইক, ফলোয়ার—সব মিলিয়ে এই পেশা এখন যেমন লোভনীয়, তেমনই ঝুঁকিপূর্ণও। জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চাপ, ট্রোলিং, আর নিজেকে প্রমাণ করার এক অদ্ভুত দৌড়। আর সেই বাস্তবতাকেই একেবারে খোলাখুলি ভাষায় সামনে আনলেন ইনফ্লুয়েন্সার তিথি বসু।
আজকাল ডট ইন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট, ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া মানে শুধু ভাইরাল হওয়া নয়, বরং দায়িত্বশীল হওয়া। তিথির কথায়, “শুধু সমাজের জন্য নয়, নিজের জন্যও দায়িত্ব নিতে হবে। এমন কিছু পোস্ট করা উচিত নয়, যেটা নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করে দেয়।” তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কন্টেন্ট দেওয়ার আগে ভাবা জরুরি—এটা কি সত্যিই প্রয়োজনীয়, নাকি শুধুই নজর কাড়ার চেষ্টা?
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ভাল ও প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়েও কথা বললে ট্রোলের শিকার হতে হয়। কিন্তু তাতেই থেমে গেলে চলবে না। “নিজের কাছে সৎ থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,” বলছেন তিথি। কারণ শেষ পর্যন্ত নৈতিকভাবে জেতাটাই আসল।
তবে এখানেই থামেননি তিনি। সরাসরি আক্রমণ করেছেন সেই ট্রেন্ডকে, যেখানে ‘ইনফ্লুয়েন্স’ নয়, ‘ভাইরাল হওয়া’-ই হয়ে উঠেছে একমাত্র লক্ষ্য। তিথির কথায়, “এখন আর কেউ মানুষকে ইনফ্লুয়েন্স করতে চায় না, সবাই চায় ভাইরাল হতে।” আর সেই ভাইরাল হওয়ার নেশাতেই অনেকেই এমন কনটেন্ট তৈরি করছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের নিজেদেরই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তাঁর পর্যবেক্ষণ, ইনফ্লুয়েন্সাররা এখন নেটদুনিয়ার ‘সফট টার্গেট’। তাঁদের আক্রমণ করলে দ্রুত নজরে আসা যায় এই মানসিকতা থেকেই বাড়ছে কটাক্ষ, ট্রোলিং। নিজের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—“ঝগড়া করে সেটা পোস্ট করা, সেটা কি কনটেন্ট? সেটাকে কি ইনফ্লুয়েন্স বলা যায়?এইজন্যই সেইসব ভ্লগাররা বাজে কথা শুনছে। এবং আমার মনে হয়, বেশ হচ্ছে! সেসব তারা ডিজার্ভও করে।”
একইসঙ্গে তিনি ব্যতিক্রমও টানলেন। তাঁর মতে, কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর আছেন, যাঁরা জানেন কীভাবে হাসির মাধ্যমে বা সৃজনশীলভাবে মানুষকে প্রভাবিত করতে হয়। তাই তাঁদের কনটেন্টে নেতিবাচকতা কম। বাকিদের ক্ষেত্রে সমস্যা অন্য জায়গায়। কীভাবে দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে হয়, সেটাই অনেকের অজানা।
সবচেয়ে কড়া সুর শোনা গেল তাঁর শেষ মন্তব্যে। নাম না করে এক ইনফ্লুয়েন্সারকে নিশানা করে তিথি বলেন, “লাইভে এসে আত্মহত্যার নাটক করা—এটা স্পষ্ট ভিউ বাড়ানোর চেষ্টা। কেউ কি সত্যিই আত্মহত্যার আগে ঢাক পিটিয়ে জানায়?”
এই এক প্রশ্নেই যেন থমকে যায় গোটা বিতর্ক। সোশ্যাল মিডিয়ার এই দুনিয়ায়, যেখানে বাস্তব আর ‘কনটেন্ট’-এর সীমারেখা দিন দিন ঝাপসা হচ্ছে, সেখানে তিথির কথাগুলো একধরনের অস্বস্তিকর সত্যই সামনে আনে ভাইরাল হওয়ার দৌড়ে আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে?
