কলকাতার বেহালা থানায় জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ‘ননসেন’ ওরফে শমীক অধিকারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ দায়েরের পরই বিষয়টি ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এক ২২ বছরের যুবতীর অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শমীককে গ্রেফতার করে পুলিশ। শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে আলিপুর আদালতে পেশ করা হয়। সেখানেই গোপন জবানবন্দি দেন অভিযোগকারিণী। পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
অভিযোগকারিণীর দাবি, ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা নাগাদ তিনি শমীকের ফ্ল্যাটে যান বন্ধুত্বপূর্ণ আমন্ত্রণে। শমীক নাকি জানিয়েছিলেন, তিনি নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করছেন এবং সেই উপলক্ষে দেখা করতে ডেকেছিলেন। যুবতীর বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন শমীকের বাবা-মাও ফ্ল্যাটে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেখানে গিয়ে সংসার গোছানোর কাজে সাহায্য করেন।
তবে অভিযোগকারিণীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনার মোড় ঘোরে রাত ৯টা নাগাদ, যখন তিনি কলেজের কথা বলে বাড়ি ফেরার জন্য ক্যাব বুক করতে চান। সেই সময় শমীক তাঁর ফোন কেড়ে নেন এবং ফোন ঘাঁটতে শুরু করেন। অভিযোগ, ফোনে শমীকের বিরোধী এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন শমীক। এরপর তাঁকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে মারধর শুরু করেন।
যুবতীর অভিযোগ, শমীক তাঁর বাবা-মায়ের সামনেই তাঁকে মারধর করেন। পরিবারের সদস্যরা বাধা দিতে এলে সবাইকে মেরে ফেলার অথবা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগকারিণীর দাবি, তাঁর চোখে গুরুতর আঘাত করা হয়, যার ফলে তিনি সাময়িকভাবে দেখতে পাচ্ছিলেন না। সেই অবস্থাতেও তাঁকে বাড়ি যেতে দেওয়া হয়নি। পরদিন সকালে বাড়ি ফেরার অনুরোধ করলেও শমীক নাকি তা অগ্রাহ্য করেন এবং তাঁর পাশে ঘুমিয়ে পড়েন। অভিযোগকারিণীর আরও দাবি, এরপর জোর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয় এবং কাউকে কিছু না বলার হুমকি দিয়ে তাঁকে ছাড়া হয়।
যুবতীর বক্তব্য অনুযায়ী, শমীক অনলাইনে তাঁর জন্য মেকআপ আনান, চোখের আঘাত ঢাকতে মেকআপ করানো হয় এবং মুখে মাস্ক পরিয়ে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়। কাউকে বিষয়টি জানালে খুন করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে শমীকের বাবা-মা সংবাদমাধ্যমের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগকারিণী দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের পরিচিত ছিলেন এবং তাঁকে তাঁরা ছেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেই জানতেন। শমীকের বাবার দাবি, মেয়েটি আগেও তাঁদের বাড়িতে এসেছেন, ইউটিউব ভিডিওতেও অংশ নিয়েছেন এবং একবার শহরের একটি পাঁচতারা হোটেলেও শমীকের সঙ্গে থেকেছেন, যার সিসিটিভি ফুটেজ থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ঘটনার দিন প্রসঙ্গে শমীকের বাবার বক্তব্য, সত্যিই সেদিন বাড়ি বদলের কাজ চলছিল এবং মেয়েটি ফুলের তোড়া নিয়ে বাড়িতে আসেন। শমীক ও ওই যুবতীর মধ্যে আলাদা ঘরে কথা হয় এবং পরে দু’জনের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। তাঁর দাবি অনুযায়ী, শমীক জানতে পারেন ওই যুবতী নাকি মিথ্যে অজুহাতে অন্য এক বন্ধুর সঙ্গে বাইরে গিয়েছিলেন, যা নিয়ে উত্তেজনা বাড়ে।
শমীকের বাবা স্বীকার করেন, রাগের মাথায় তাঁর ছেলে ওই যুবতীকে একটি চড় মেরেছিল, যা তিনি নিজেও অন্যায় বলে মানছেন। তবে তাঁর দাবি, গুরুতর মারধর বা নির্যাতনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তর্কের সময় হাত চেপে ধরা বা ধাক্কাধাক্কির কারণে কালশিটে দাগ বা নখের আঁচড় লেগে থাকতে পারে।
পরিবারের দাবি, ওই যুবতীর শুশ্রূষা করা হয়েছিল, তাঁকে স্যুপ খাওয়ানো হয় এবং ওষুধ এনে দেওয়া হয়। রাতে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়নি, বরং পরদিন সকলে মিলে ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়া হয়। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, বিদায়ের সময় যুবতী হাত নেড়ে বিদায় জানান এবং পরে ফোনেও যোগাযোগ হয়েছিল। শমীকের বাবার অভিযোগ, এরপর ওই যুবতীর এক বন্ধু তাঁদের ফোন করে হুমকি দেয় এবং ঘটনার পরবর্তী সময়ে অভিযোগের রূপ বদলায়।
সবশেষে শমীকের বাবা দাবি করেন, গোটা ঘটনায় রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর কথায়, তাঁদের পরিবারের কেউই বিজেপির সমর্থক নন।
এই মুহূর্তে অভিযোগ ও পাল্টা দাবির মাঝেই তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। গোপন জবানবন্দি, মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগোবে বলে জানা গিয়েছে।
