জীবনটা মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই এক নতুন রূপ নিয়েছিল। চার্চের ৪০০ অতিথির সামনে আজীবন পাশে থাকার অঙ্গীকার করে সবেমাত্র ‘আই ডু’ বলেছিলেন দু’জনে। কিন্তু কে জানত, সেই রূপকথার মতো বিয়ের আসর থেকে হানিমুনের উদ্দেশ্যে ওড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেমে আসবে চরম ট্র্যাজেডি! আমেরিকার জর্জিয়া  প্রদেশে এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ২৬ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিমানচালক ড্যাভ ফিজি । ওঁর পরিবার মূলত কেরলের বাসিন্দা।

মর্মান্তিক বিষয় হল, এই দুর্ঘটনায় ড্যাভ এবং হেলিকপ্টারের পাইলটের মৃত্যু হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন তাঁর স্ত্রী জেসনি। পেশায় নার্স জেসনি গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে আটলান্টার একটি হাসপাতালে আপাতত চিকিৎসাধীন।

 

ড্যাভের বাবা জর্জ ফিজি সংবাদমাধ্যম ‘আটলান্টা নিউজ ফার্স্ট’ -কে চোখের জলে জানান, ওঁর ছেলে জেসনিকে অসম্ভব ভালবাসত। প্রায় এক দশক আগে ‘নিউ টেস্টামেন্ট চার্চ’-এ তাঁদের প্রথম দেখা ও প্রেম। গত শুক্রবার জর্জিয়ার ডসনভিলের ‘দ্য রিভেয়ার’ নামক একটি চমৎকার ভেন্যুতে বসেছিল তাঁদের বিয়ের আসর। চারশো অতিথির উপস্থিতিতে ধুমধাম করে বিয়ে সারেন তাঁরা।

বিয়ের রিসেপশন শেষ হওয়ার পর নবদম্পতির জন্য একটি বিশেষ সারপ্রাইজ বা ‘স্পেশাল সেন্ডঅফ’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। ডসনভিলের ভেন্যু থেকে একটি ‘রবিনসন আর৬৬’  হেলিকপ্টারে চড়ে তাঁদের আটলান্টার একটি ডাউনটাউন হোটেলে যাওয়ার কথা ছিল, যেখান থেকে পরদিন তাঁদের হানিমুনে ওড়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই ডসনভিল কাউন্টির একটি প্রত্যন্ত জঙ্গলঘেরা এলাকায় ভেঙে পড়ে হেলিকপ্টারটি।

দুর্ঘটনার পর জর্জিয়ার দুর্গম বনাঞ্চল হওয়ার কারণে উদ্ধারকারীদের দুর্ঘটনাস্থল খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। এই দীর্ঘ সময় ধরে গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় হেলিকপ্টারের ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই আটকে ছিলেন কনে জেসনি। প্রায় ৬ ঘণ্টা পর যখন উদ্ধারকারীরা ওঁর কাছে পৌঁছান, তখন ওঁর কোলে শুয়ে রয়েছে স্বামী ড্যাভের নিথর দেহ।

ড্যাভের বাবা জর্জ ফিজি জেসনির বয়ান উল্লেখ করে বলেন, “জেসনি যখন জ্ঞান ফিরে পায়, ও দেখে আমার ছেলে ড্যাভ ওঁর বুকের ওপর মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। ড্যাভের সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল এবং ওঁর দেহটা ততক্ষণে সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। জেসনি নিজে পেশায় একজন নার্স, তাই ওঁর বুঝতে এক মুহূর্তও সময় লাগেনি যে ড্যাভ আর এই পৃথিবীতে নেই। ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তবে ওঁর চিকিৎসা চলছে।”

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে গভীর কুয়াশা এবং প্রতিকূল আবহাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, ড্যাভ নিজে ‘ডেল্টা এয়ারলাইন্স’ -এর একজন ফার্স্ট অফিসার (পাইলট) হওয়ায় ওড়ার আগেই আবহাওয়ার বিপদ টের পেয়েছিলেন।

ওঁর বাবা জর্জ জানান, ওড়ার ঠিক আগে ড্যাভ হেলিকপ্টারের পাইলটকে সতর্ক করে বলেছিলেন— “এখন ভিজিবিলিটি একদম জিরো (। আর যখন আবহাওয়া এমন থাকে, তখন আমরা (বিমানচালকেরা) কখনো উড়ি না।” কিন্তু ড্যাভের সেই অভিজ্ঞ পরামর্শকে উপেক্ষা করেই হেলিকপ্টারটি ওড়ানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে এখন তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনায় জেসনি বেঁচে ফিরলেও, যে চার হাত এক হয়েছিল চিরকাল একসঙ্গে চলার জন্য, তা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চিরতরে আলাদা হয়ে গেল।