ভারত-পাক সীমান্তের ঐতিহ্যবাহী আটারি বর্ডারে আজ এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল আপামর দেশবাসী। অস্কার ও গ্র্যামি জয়ী কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক এ আর রহমান এই প্রথমবার আটারি সীমান্তের জেসিপি স্টেডিয়ামে লাইভ পারফরম্যান্স করলেন। সীমান্তরক্ষা বাহিনী বা বিএসএফ (BSF) জওয়ানদের বীরত্ব ও ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজিত হয়েছিল এই বিশেষ অনুষ্ঠান, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘জয় হো – এ মিউজিক্যাল স্যালুট টু দ্য ব্রেভহার্টস’।
বিখ্যাত ‘বিটিং রিট্রিট’ অনুষ্ঠানের সময় আয়োজিত এই লাইভ কনসার্টে আজ উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার দর্শক। দেশাত্মবোধ, গর্ব এবং আবেগের এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে তখন তৈরি হয়েছিল এক বৈদ্যুতিক পরিবেশ। উপলক্ষ ছিল পরিচালক ইমতিয়াজ আলি-র আগামী ছবি ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-র মিউজিক রিলিজ এবং দেশের বীর জওয়ানদের প্রতি এক সুরের শ্রদ্ধার্ঘ।

আটারি বর্ডারে এই পারফরম্যান্সের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে এক গভীর সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ সিনেমাটির মূল গল্প গড়ে উঠেছে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের সেই বেদনাদায়ক প্রেক্ষাপট, দেশত্যাগ এবং ভাঙা হৃদয়ের প্রেক্ষাপটে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিযায়ী যাত্রার ওপর ভিত্তি করে এবং সেই সময়কার মানুষের যন্ত্রণার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এই ছবি তৈরি করেছেন ইমতিয়াজ। দেশভাগের বহু দশক পর, যখন সমস্ত দুঃখ-কষ্টের কাহিনী মলিন হয়ে গেছে, তখনো মানুষের মনে রয়ে গেছে সেই শুরুর দিকের ভালবাসার এক গোপন অনুভূতি— যা তাঁরা কাউকে বলতে পারেননি। আর ঠিক সেই সীমান্তের বুকেই যখন এ আর রহমানের সুর ধ্বনিত হল, তখন আবেগ ধরে রাখতে পারেননি খোদ সেনা জওয়ানেরাও।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পরিচালক ইমতিয়াজ আলি, বিড়লা স্টুডিওসের অনন্যা বিড়লা, ছবির অভিনেতা বেদং রায়না এবং উইন্ডো সিট ফিল্মসের প্রযোজক মোহিত চৌধুরী সীমান্তরক্ষা বাহিনীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। ছবির নির্মাতারা তাঁদের এই আগামী মিউজিক অ্যালবামটি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সমস্ত বীর জওয়ানদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
এ আর রহমানের জাদু দিয়ে শুরু হওয়া এই সঙ্গীতানুষ্ঠানে একের পর এক দেশাত্মবোধক ও সিনেমার গান পরিবেশন করা হয়।অনুষ্ঠানের সূচনা হয় রহমানের নিজের গাওয়া আধ্যাত্মিক ও মেলোডিয়াস গান ‘চন্দা সূরজ লাখো তারে’ দিয়ে।এরপর মঞ্চে ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ ছবির গানের লাইভ পারফরম্যান্স শুরু হয়। ছবির গান ‘মাসকারা’ গেয়ে শোনান নীলাঞ্জনা ঘোষ এবং অভিনেতা বেদং রায়না।ছবির অন্যতম রোমান্টিক গান ‘ইশক মস্তানা’নিয়ে মঞ্চে ঝড় তোলেন জনপ্রিয় গায়ক মোহিত চৌহান, সঙ্গে ছিলেন পূজা তিওয়ারি এবং নার্গিস।অনুষ্ঠানের একদম শেষলগ্নে যখন এ আর রহমান ওঁর আইকনিক সৃষ্টি ‘মা তুঝে সালাম’ গাইতে শুরু করেন, তখন ভারত-পাক সীমান্তের আকাশ-বাতাস দেশপ্রেমে মুখরিত হয়ে ওঠে এবং উপস্থিত দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়।
সীমান্তের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পরিচালক ইমতিয়াজ আলি নিজেও। তাঁর কথায়, “এটি একটি অত্যন্ত অনন্য এবং ঐতিহাসিক ঘটনা। জেসিপি স্টেডিয়ামে আটারি গেটের সামনে লাইভ পারফর্ম করছেন এ আর রহমান! এই পারফরম্যান্স আসলে আমাদের জাতীয়তাবোধ, সীমান্তের বিএসএফ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীর জওয়ানদের ত্যাগ এবং আমাদের একসূত্রে বেঁধে রাখা ভালবাসার প্রতি এক পরম শ্রদ্ধা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় যখন সীমানা তৈরি হচ্ছিল, তখন শুধু মানুষের ঘরবাড়ি বা জীবন নষ্ট হয়নি, লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ও ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এই সিনেমা সেই যন্ত্রণার বুক থেকেই উঠে এসেছে। আমরা আজ এখানে ভালবাসার বার্তা নিয়ে এসেছি, কারণ দিনের শেষে কেবল ভালবাসাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।”
ইমতিয়াজ আলির চেনা চেনা প্রেম ও বিরহের নকশায় তৈরি ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ ছবিতে অভিনয় করেছেন একঝাঁক তারকা— দিলজিৎ দোসাঞ্জ, নাসিরুদ্দিন শাহ, শর্বরী ওয়াঘ এবং বেদং রায়না। ছবির গানগুলো লিখেছেন ইরশাদ কামিল এবং সুর দিয়েছেন এ আর রহমান।
বিড়লা স্টুডিওস, অ্যাপ্লজ এন্টারটেইনমেন্ট এবং উইন্ডো সিট ফিল্মসের যৌথ প্রযোজনায় তৈরি এই ছবি আগামী ১২ জুন, ২০২৬ তারিখে বিশ্বজুড়ে বড়পর্দায় মুক্তি পেতে চলেছে। আটারি বর্ডারের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর ছবিটির সঙ্গীত এবং এর মুক্তির জন্য দর্শকদের অপেক্ষা যে কয়েক গুণ বেড়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য।
















