তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা রাহুল অরুনোদয় ব্যানার্জির৷ তাঁর মৃত্যুর কারণ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক৷ সুরক্ষা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন৷ আজকাল ডট ইন যোগাযোগ করেছিল অভিনেতা খরাজ মুখার্জির সঙ্গে। অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন খরাজ মুখার্জি৷
খরাজ বলেন, "আউটডোর শুটিংয়ের ক্ষেত্রে বড় ইউনিট যায়৷ রাহুল এমন এলেবেলে অভিনেতা নয় যে তাঁর দিকে নজর দেওয়ার দরকার নেই৷ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করা কোনও একজন অভিনেতার যদি কোনও শারীরিক ক্ষতি হয় তাহলে তো পুরো ইউনিটের ক্ষতি৷ এতগুলো মানুষ থাকা সত্ত্বেও একটা শিল্পীর এই পরিণতি হয় কী করে? কেউ কি দেখল না? প্রোডাকশন ম্যানেজার বা ইউনিটের বাকিরা কোথায় ছিল? "
খরাজ মুখার্জি আরও বলেন, "এই যে আমরা শুটিং করতে বেরোই, কার ভরসায় যাই, এই যে বেরোই ইউনিটের ভরসাতেই যাই৷ আমার প্রশ্ন, এতগুলো লোক কোথায় ছিল তখন?"
আজকাল ডট ইন-এর তরফে প্রশ্ন করা হয়েছিল, শুটিং করতে গিয়ে খরাজ মুখার্জি কখনও কি সুরক্ষার অভাববোধ করেছেন? খরাজ মুখার্জি বলেন, "সুরক্ষা কিছুটা নিজের উপরেও নির্ভর করে৷ আমি গাড়ি চালাতে পারি না বলে ৬-৭ টা কাজ ছেড়েছি৷ রাজা চন্দ, অনিকেত চট্টোপাধ্যায় আমাকে দিয়ে গাড়ি চালানোর দৃশ্যে অভিনয় করিয়েছেন৷ তখন আমার সুরক্ষার কথা ভেবে আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি যে গাড়ি চালাইনি তা সিনেমা দেখে বোঝার উপায় নেই৷ সতর্ক থাকার দায়িত্ব আমাদের সকলের৷"
ছবির শুটিংয়ের ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে ধারাবাহিকের ক্ষেত্রেও কি সেই নিরাপত্তা থাকে? আজকাল ডট ইন-এর প্রশ্নের জবাবে খরাজ জানান, "থাকা তো দরকার৷ কাজটা তো কাজই৷ মাধ্যম যাই হোক, তার জন্য তো কারও বিপদ হওয়া কাম্য নয়৷"
সুরক্ষার প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিয়েছেন খরাজ মুখার্জি। তিনি বলেন, "বগলামামা-তে অভিনয় করার সময় পুকুরে ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্য ছিল৷ এই দৃশ্যে অভিনয়ের আগে খরাজ নিশ্চিত করেছিলেন যে পুকুরে এমন কোনও কিছু নেই যাতে শারীরিক কোনও বিপদ হতে পারে৷"
রাহুলের সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন ঘটনার কথা বলেন স্মৃতিকাতর খরাজ৷ আজকাল ডট ইন-কে খরাজ বলেন, "সেদিনই একটা ছবি করলাম ফুটানি গঞ্জের মহেশ, সায়ন্তনের ছবি৷ ছবিতে আমার সঙ্গে রাহুলের গভীর রাত পর্যন্ত একটা সিন ছিল৷ শুটিংয়ের পর আমাকে জিজ্ঞেস করল খরাজদা ঠিক আছে? আমি বললাম হ্যাঁ এডিট করার পর ঠিকই তো লাগবে মনে হচ্ছে৷"
স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে খরাজ বলেন, রাহুল ওঁর ছেলের মতো৷ অনেক ছোট থেকে রাহুলকে চেনেন৷ যখন রাহুল বলে পরিচিতি ছিল না, যখন রাহুল 'এক আকাশের নীচে' ধারাবাহিকে অভিনয় করতেন সেই সময় থেকে রাহুলকে চেনেন খরাজ মুখার্জি। খরাজের কথায়, "তখন ও তো রাহুল না, তখন ও অরুণোদয়। সেখান থেকে প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে ওর পরিচয়, প্রেম, বিয়ে জীবনের নানা ওঠাপড়া দেখেছি, আমি ওদের খবর রাখতাম৷ রাহুল খুব জ্ঞানী৷ পড়াশোনা করত৷"
মিশুকে রাহুল বোলপুরে শুটিং করছিলেন খরাজ মুখার্জির সঙ্গে। ছবির নাম ছিল 'শহর থেকে দূরে'৷ সেখানে গিয়ে খরাজ রান্না করতে পারেন জেনে রাহুল আবদার করেছিলেন, "খরাজদা আমাদের চিংড়ি মাছের মালাইকারি খাওয়াও৷ "
শুটিংয়ের মাঝে একদিনের ছুটিতে রাহুল কলকাতা গিয়েছিলেন৷ ফেরার সময় চিংড়ি মাছ নিয়ে আসবেন এবং খরাজ রান্না করবেন এই ছিল রাহুলের আবদার৷ "প্রায় কিলো পাঁচ-ছয় চিংড়ি মাছ আনল থামোর্কলের বাক্সে বরফ দিয়ে৷ সবাই মিলে হইহই করে খাওয়া দাওয়া করলাম আমরা", বললেন খরাজ
'চিরদিনই তুমি যে আমার' ছবিতে রাহুলের পড়ে যাওয়ার একটা দৃশ্য ছিল৷ সেই দৃশ্যে রাহুলের সাবলীল অভিনয় এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে তারপর থেকে পরিচালকেরা রাহুলের জন্য একটা পড়ে যাওয়ার দৃশ্য রাখতে চাইতেন, মজার ছলে খরাজকে গল্প করেছিলেন রাহুল৷
'গোড়ায় গন্ডগোল' ছবিতে অনিকেত চট্টোপাধ্যায়কে রাহুল বলেছিলেন, "গোটা ছবিতে একটা পড়ার দৃশ্য রাখলে না? আমি কোথায় পড়ব? অনিকেত চট্টোপাধ্যায় অবাক হয়ে পড়ার কারণ জানতে চাইলে রাহুল জানান পড়ে যাওয়াটাই তাঁর সিগনেচার৷ রাহুলের দাবি মেনে অনিকেত চট্টোপাধ্যায় নতুন বর ধুতি পাঞ্জাবি পরে বিয়ে করতে আসার সময় পড়ে যাবে- এমন দৃশ্য রাখেন৷ "সেই দৃশ্যে রাহুলের অভিনয় ছিল দেখার মতো", বললেন খরাজ৷
খরাজ মুখার্জিকে সহজ-কথায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাহুল৷ শুটিংয়ের চাপ কমলেই যাবেন জানিয়েছিলেন খরাজ। এর মাঝেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা৷ জানা গিয়েছে, ২৯ মার্চ রবিবার তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাঁর! দুর্ঘটনার শিকার হন। এদিন সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। ওড়িশার তালসারি সংলগ্ন অঞ্চলের সমুদ্রে বোটে চেপে ঘোরার সময় বোট থেকে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে উদ্ধার করে ওড়িশার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে অভিনেতাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছে চিকিৎসকের দল। এইমুহূর্তে অভিনেতার দেহ দীঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়েছে।
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন কোনওভাবে সমুদ্রে নেমেছিলেন রাহুল। এবং তলিয়ে যান! তারপর দীর্ঘক্ষণ ধরে তাঁর খোঁজ না পাওয়া যাওয়ায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। এরপর তাঁর দেহ পাওয়া গেলে ৬টা ২০নাগাদ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে, চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করে। পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করেছে এবং অভিনেতার দেহটিকে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
















