“আমার ছোটবেলাটা জুড়ে রয়েছে আটের দশক। কয়েক কুচি নয়ের দশকও। সেই সময়ের দোল উদ্‌যাপনটা পুরো অন্যরকম ছিল। আমাদের উত্তর কলকাতার পাড়াতেই বাবার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম সকাল সকাল। সেই সময় আবির দিয়েই বেশিরভাগ দোলটা খেলা হত। এবং স্রেফ লাল আবির দিয়েই। এখন তো নানান রঙের আবির দেখতে পাই...তখন কিন্তু আবির বলতে আমরা শুধু লাল আবির-ই বুঝতাম। রং খুব বেশি ব্যবহার হত না। বাঁদুড়ে রঙের তো প্রশ্নই নেই! তখন ওই আবির রাখার জন্য এক ধরনের সাদা রঙের বটুয়া পাওয়া যেত। মোটামুটি পাড়ার সবাই সফেদ কাপড় পরে ওই বটুয়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ত রাস্তায়। এরপর পাড়ার যত বয়স্ক লোক ছিলেন, তাঁদের পায়ে আবির লাগিয়ে নমস্কার করতাম। তাঁরাও আমাদের গালে-মাথায় আবির মাখিয়ে আশীর্বাদ করতেন। 


এরপর পাড়ার একটা মোড়ে বাবার সঙ্গে গিয়ে হাজির হতাম। ওখানে পাড়ার অনেকেই থাকতেন। পাড়ার দাদু-কাকু থেকে শুরু করে ছেলে ছোকরারা যেমন থাকত, তেমন আমাদের মতো ছোটরাও গিয়ে ভিড় করতো। প্রথমে ঢোল-করতাল বাজিয়ে একচোট গান হত, তবে সেটা মোটেই তারস্বরে নয়। এবং সেসব থামলে সেখানেই পাড়ার সবাই মিলে প্রাতঃরাশ সারতাম। সবাই মিলে লুচি ভাজছে, সঙ্গে সাদা আলুর ছেঁচকিও রান্না হচ্ছে, আহা! এরকম করে সকাল এগারোটা-সাড়ে এগারোটা বেজে গেলে বড়রা আস্তে আস্তে বাড়ি চলে যেতেন। আর তারপর একে একে পিচকিরি বের হতো এর-ওর হাতে। সেটা নিয়েও খানিকক্ষণ নির্দোষ হুল্লোড় চলত। এরপর দুপুর একটা-দেড়টার মধ্যে ছোটরাও বাড়ি ঢুকে যেত। তারপর স্নান সেরে জমিয়ে খাসির কষা মাংস আর ভাত। শেষপাতে পেতাম মিষ্টিও।  


এরপর বিকেল যখন গুটিগুটি পায়ে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে, তখন আমাদের পাড়াতেই পরিচিত এক বাড়িতে গানের আসর বসত। সঙ্গে খানাপিনা তো আছেই। যেতাম বাবার হাত ধরে। সকালবেলা পাড়ায় যেমন শুধুই রবীন্দ্রসঙ্গীত হত, ওই আসরে কিন্তু তেমনটা ছিল না। পাল্লা দিয়ে আধুনিক বাংলা গানও গাওয়া হত। আবার কেউ আবৃত্তি করতেন, কেউ বা শ্রুতিনাটক। সবটাই অবশ্য দোল সংক্রান্ত। তখন বাবা-কাকুরা পাশের ঘরে চলে যেত। আমাদের সেই ঘরে যাওয়া নিষেধ ছিল, কারণ বুঝতে পারতাম ওঁরা তখন কিঞ্চিৎ মদ্যপান করছেন। আসর শেষে প্রতি বছর নিয়ম করে রবি ঠাকুরের গানটা সবাই মিলে গাইতাম – ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও গো এবার যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও...’ তা এইভাবে দোল কাটত।  

 

তবে ওই ছোটবেলায় চুটিয়ে দোল খেললেও গত তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে আমি আর দোল খেলি না। এর পিছনে একটা কারণ আছে। সেটা নয়ের দশকের একদম শুরুর দিকে। আমাদের পাড়ার এক দাদা ছিলেন। অপূর্ব গান গাইতেন।কিশোরকণ্ঠী হিসেবে তখন দারুণ নামডাক শুরু হয়েছে তাঁর। এরকম সময় এক দোলের দিন রং খেলতে খেলতে সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে যান তিনি। আর পড়ে গিয়েই তৎক্ষণাৎ মৃত্যু! এই ঘটনায় কেঁপে গিয়েছিল গোটা পাড়া। ওই ঘটনাটি আমাদের মনে এতটা অভিঘাত সৃষ্টি করে যে আজ পর্যন্ত আর কখনও দোল খেলিনি আমি। এবং ওই ঘটনাটার পরে আমাদের পাড়াতেও প্রায় বছর পনেরোর মতো আর দোল খেলা হয়নি। রেওয়াজটাই প্রায় উঠে গিয়েছিল। এরপর নতুন প্রজন্ম আসে, আস্তে আস্তে ফের পাড়ায় রং খেলা শুরু হয়। কিন্তু আমরা আর খেলতে পারি না। 


আর সত্যি কথা বলতে কী আজকাল যেভাবে রং খেলা হয়, সেই বিষয়টা আমার মোটেও ভাল লাগে না। দোল খেলা মানেই নেশা করার একটা বাঁধনছাড়া প্রবণতা। ওটাই যেন মূল উদ্দেশ্য! আর গানবাজনার পাট তো এককথায় উঠেই গিয়েছে। তাই দোলের দিনে ছোটবেলার স্মৃতিতে ডুব দিই। বাবা নেই, পাড়ার কাকা-জ্যাঠারাও আজ আর নেই। ছোটবেলার বেশিরভাগ বন্ধুরাই আজ প্রায় সবাই পাকাপাকিভাবে বিদেশে। তাই এদিন কোনও অনুষ্ঠান না থাকলে আমি সারাটা দিন বাড়িতেই থাকি। বইপত্র, গানবাজনা, সিনেমা নিয়েই থাকি। তবে হ্যাঁ, একটা জিনিস দোলের দিন আমি আজও নিয়ম মেনে করি। এদিন সন্ধ্যার পর সুমিত্রা সেনের কণ্ঠে –‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও গো এবার যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও...’ গানটি শুনি। মানে শুনবই। এই একটি ব্যাপার আমাকে এক লহমায় ছোটবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। চোখ বুজলেই ছোটবেলার দোলের দিনগুলোতে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই গান তখন সেতু হয়ে যায় আমার কাছে। 

 

এখন তো চারপাশে দেখি হোলি পার্টি...আরও কত কী। আজকাল দোল উদ্‌যাপনটা যেভাবে হয় তার জন্য কিন্তু যুব সম্প্রদায় মোটেই দোষী নয়। একটু বুঝিয়ে বলি। আমাদের সময়ে যৌথ পরিবার ছিল, ই.এম.আই বলে বস্তুটি ছিল না। কাজেই প্রথিবীর সবাই সবাই গাড়ি-বাড়ি কিনে নেয়নি। সবাই অল্পেই সন্তুষ্ট থাকত।  আমাদের সময় সততা বলে একটা ব্যাপার তখনও বিশ্বাস করত মানুষ। আমরা সারা বছর একবারই নতুন জামা পেতাম, পুজোর সময়। দাদাদের জামাকাপড় পরে দিব্যি নিজেদের চালিয়ে নিত আমার বন্ধুবান্ধবরা। বলতে চাইছি, আকাশছোঁয়া আকাঙ্খা বলে কিছুই ছিল না। আর এখন মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘আরও বেশি চাই’ ইনজেকশনের সূঁচ ফুটিয়ে দেওয়া হয়েছে! তবে চাইলেই তো পাওয়া যায় না। ফলে এক ধরনের ফ্রাস্ট্রেশন তৈরি হয়েছে। আর এই ধরনের উৎসবের মধ্যে দিয়ে তারা তাদের এই ফ্রাস্ট্রেশনটা নানানভাবে বের করে। এই পদ্ধতির মধ্যে সবথেকে সহজ হচ্ছে নেশা করা, বীভৎস জোরে, উৎকটভাবে ডিজে বাজানো! যাতে করে এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত অপ্রাপ্তি, যন্ত্রণা তারা ভুলে থাকতে পারে। এটার জন্য তারা কিন্তু মোটেই দায়ী নয়। দায়ী আমাদের সমাজব্যবস্থা, দায়ী আমরা! 

 

এই সমাজ তাদেরকে এমন জায়গায় এনে ফেলেছে যাতে এই মানুষ প্রচণ্ড অবসাদের শিকার হয়ে যাচ্ছে। এবং সেই অবসাদ কীভাবে কাটানো যায়, সেই উপায় তাকে শেখানো হয়নি। ভাল সিনেমা দেখা, বই পড়া, গান শোনাও যে এর ওষুধ হতে পারে সেটা তারা জানে না। আসলে, শিখবেই বা কাদের থেকে? সংসারগুলো ভাঙতে ভাঙতে সবই এখন নিউক্লিয়াস ফ্যামিলি। পাড়ার বয়স্কদেরও প্রায় কেউ আর সম্মান করে না। সবথেকে বড় কথা মাঠও নেই। আগে মাঠ ছিল, খেলাধুলো হত চুটিয়ে। বন্ধুবান্ধব হত, কেউ নিঃসঙ্গ ছিল না। আর মাঠঘাট-খেলা না থাকার ফলে নিঃসঙ্গতাই এখন সবথেকে কাছের! নিঃসঙ্গতা থেকেই তৈরি হচ্ছে অবসাদ। ফলে এই উৎসবের দিনগুলো য় তারা সেসব ভুলে থাকার জন্যেই খানিক অসভ্যতামো করে ফেলে। আর এই দায় তো আমাদের নিতেই হবে। কারণ আমরা তাদের একটা সুন্দর-সুস্থ সমাজ দিতে পারিনি, কিছুই দিতে পারিনি। আমাদের সময়ে যে সম্পদগুলো আমরা উপভোগ করেছি আমাদের পূর্বসূরিদের থেকে সেসবেই কিছুই আমরা আগামী প্রজন্মের মধ্যে ট্রান্সফার করতে পারিনি। সেই অক্ষমতাই আমাদের ব্যর্থতা, তাদের নয়। তাই নয়া প্রজন্মকে এ অবস্থায় দেখলে আমার রাগ হয় না কিন্তু। বরং অসহায় লাগে, মায়া লাগে...”