শতরূপা সান্যালের মেয়ে বা ঋতাভরী চক্রবর্তীর দিদি নয়, চিত্রাঙ্গদা শতরূপা অভিনয় দক্ষতা দিয়েই স্বতন্ত্র। এনআইডিয়াস প্রযোজিত, সৌরভ পালোধীর পরিচালনায় ‘অনেকদিন পর’ ছবিতে মল্লিকার চরিত্রে চিত্রাঙ্গদা। অনেকদিন পর আবার বড়পর্দায়, কেন তাঁকে বাংলা ছবিতে কম দেখা যায়? মা হওয়ার পর কীভাবে সামলাচ্ছেন কেরিয়ার ও সদ্যোজাতকে? ছবিমুক্তির আগে অন্তরঙ্গ আড্ডায় অভিনেত্রী, সঙ্গে শ্যামশ্রী সাহা
কেমন আছেন? মা হওয়ার আনন্দ কতটা উপভোগ করছেন?
চিত্রাঙ্গদা: ‘বেড অফ রোজেজ’ বলব না। যথেষ্ট কঠিন একটা যাত্রা। তবে আনন্দ আছে। কী জানেন তো, একলাইনে ম্যাজিকাল বা টায়ারিং বলা যায় না।এত রকমের ইমোশন কাজ করে, হঠাৎ করেই সবকিছু যেন বদলে যায়। স্বার্থহীন ভালবাসা কাকে বলে আগে কখনও বুঝতেই পারিনি। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। ওর চোখে এই পৃথিবীটাকে সুন্দর করে দেখানোটা আমার দায়িত্ব। সেটাই রোজ একটু একটু করে শিখছি।

ইনকা কি রাতে ঘুমোয়?
চিত্রাঙ্গদা: এই সাইকেলটা একরকম তো থাকে না। এই এখন একটা লম্বা ঘুম দিচ্ছে। তাই কথা বলতে পারছি। ও ঘুমোলেও নিশ্চিন্তে থাকতে পারি না। মাঝে মাঝেই ছুটে গিয়ে দেখি ও ঠিক আছে তো!
মা হওয়ার পর মাকে নতুন করে বুঝতে পারলেন?
চিত্রাঙ্গদা: মা হওয়ার আগেই...যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম, নানারকম শারীরিক অসুবিধা হত, মাকে বলতাম তুমি এত কষ্ট পেয়েছ, মা শুধু হাসতেন। তখন বুঝতে পেরেছিলাম মায়েরা কতটা শারীরিক, মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে একটা প্রাণকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। তারপর তো সেই চাপ আরও বাড়ে। আমাদের যেদিন জন্মদিন, মা হিসাবে সেদিন তো মায়েরও জন্মদিন, তাই ঠিক করেছি জন্মদিন মায়ের সঙ্গে সেলিব্রেট করব। একসঙ্গে কেক কাটব।

অনেকদিন পর বাংলা ছবিতে। আপনার মতো অভিনেত্রীর তো বাংলা ছবিতে আরও বেশি কাজ করার কথা?
চিত্রাঙ্গদা: এটা তো আমার কাছেও একটা বিস্ময়। এমন নয় যে যাঁরা কাজ করছেন তাঁরা আমাকে চেনেন না, আমার কাজ দেখেননি। এটা নিয়ে আমিও কনফিউজড। মুম্বইতে তো অডিশন হয়, এখানে সেটা হয় না। তাই হয়তো ঠিকঠাক কাজ ঠিকঠাক লোকের কাছে পৌঁছয় না। এটা আমার ভাবনা। যখন ‘আহারে মন’ করি, অডিশন দিয়েই পেয়েছিলাম। ওই কাজটা তো দর্শকের ভাল লেগেছিল। যাঁরা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেন বা কাজ দেন তাঁদেরও ভাল লেগেছিল। তখন ভেবেছিলাম সবার ভাল লেগেছে, এবার হয়তো আরও কাজ পাব। পরে বুঝতে পেরেছি, ভাল কাজ করে কাজ পাওয়া যায় না। আরও কিছু ফ্যাক্টর আছে।
সেটা কী ?
চিত্রাঙ্গদা: এখনও সবটা বুঝে উঠতে পারিনি। পিআরটাও যথেষ্ট নয়। ধরুন কারও কাজ ভাল লেগেছে, তাকে বলেছি তোমার সঙ্গে কাজ করতে চাই। এর থেকে বেশি আর কী করব বলুন! তার বাড়ির সামনে গিয়ে বসে থাকব? আর কাজের জন্য ফেক বন্ধুত্ব করতে পারব না। সৌরভের (পালোধী) সঙ্গে তো আমার আলাপই ছিল না। ও নিশ্চয়ই আমার কাজ দেখেই যোগাযোগ করেছে। ইন্ডাস্ট্রিতে এখনও এমন মানুষ আছেন, যাঁরা কাজ দেখেই যোগাযোগ করেন। আমিও তাঁদের সঙ্গেই কাজ করতে চাই যাঁরা অভিনয় দক্ষতা দেখেই কাস্ট করেন। সৌরভ বহুবছর আগে আমার একটা নাটক দেখেছিল, এতবছর পর ও আমাকে ফোন করে ‘অনেকদিন পর’ ছবির গল্প শোনায়। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে কাস্ট করার কথা কী করে ভাবলে? সৌরভ বলেছিল, ওই নাটকে আমার কাজ ওর ভাল লেগেছিল। আসলে কী জানেন তো, আমি যদি কাজটা ঠিকমতো করে যেতে পারি তাহলে ঠিক সময়ে ঠিক লোকটা ডেকে নেবে। ‘আহারে মন’-এর পর খুব আশাবাদী ছিলাম, এবার হয়তো বাংলা ছবি যাঁরা করেন, আমাকে আপন করে নেবেন। অনেক কাজ করতে পারব, সেটা তো হয়নি। তাই এখন আর ভাবি না।

এই কথাটাতো অভিনেতাদের শুনতে হয় তোমার মতো চরিত্র থাকলে নিশ্চয়ই ডাকব, সেটাই কি কারণ?
চিত্রাঙ্গদা: না, আমার তা মনে হয় না। এটা একদমই সত্যি কথা না। বহু ছবিতে দেখেছি, এমন কাউকে কাস্ট করা হয়েছে, সেই চরিত্রে অভিনেতা, অভিনেত্রীরা বেমানান। তাও তিনি কাজ পাচ্ছেন। এই যে এই কথাটা বললাম, তারজন্যও হয়তো কাজ পাব না। একটা ঘরের মধ্যে যে কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে সেটা তারাই জানেন। তবে পরিচালকের হাতে সবটা থাকে না। সেটাও বুঝি। এখন আবার নতুন জিনিস হয়েছে কার কত ফলোয়ার্স আছে, আবার অনেকেই সঙ্গে একটা পিআর নিয়ে ঘুরছে।
ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে মার সঙ্গে কথা হয়?
চিত্রাঙ্গদা: খুব যে আলোচনা হয় তা নয়, মা তো বাবার (উৎপলেন্দু চক্রবর্তী) ছবিতেই কাজ করেছেন বেশি। ‘অন্য অপালা’য় কাজ করার সময় সমস্যা হয়েছে। শুটিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কয়েকবছর আগে বাচ্চাদের নিয়ে একটা ছবি বানানোর সময়ও এই ধরনের ঝামেলা হয়েছে। মা খুব লড়াকু। তবে সিনিয়র কাউকে যদি এরকম হ্যারাজমেন্ট ফেস করতে হয়, সেটা তো ইন্ডাস্ট্রির জন্যও লজ্জাজনক। একটা ঘটনার কথা খুব মনে পড়ছে...
বলুন না
চিত্রাঙ্গদা: চতুর্থ কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব, তখন ক্লাশ থ্রিতে পড়ি। মায়ের ছবি দেখানো হয়েছিল। এই ধরনের উৎসবের তো একটা আলাদা পরিবেশ, আভিজাত্য থাকে, সেটা দেখেছিলাম। এর বহুবছর পর যখন আমার ছবির জন্য কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে যাই, পুরো আলাদা পরিবেশ। যাঁদের চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্ধোধনে থাকা উচিত, তাঁদের কাউকে দেখা যেত না।

বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে নয়, মুম্বই আপনাকে অভিনেত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দিল। খারাপ লাগে?
চিত্রাঙ্গদা: এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মুম্বইয়ে কাজ করেছি, তারপর এখানে ডাক পেয়েছি। এটা বারবার হয়েছে। অনেকে হয়তো রেগে যেতে পারেন, কিন্তু এটাই সত্যি। আমি অনেক ছবি করতে চাই না। বছরে একটা দু’টো ভাল ছবি করতে চাই। একজন অভিনেত্রী যখন মাসের পর মাস বাড়িতে বসে থাকে, হাতে কাজ থাকে না, আমি সেই ফেজটার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে কী করছ, তোমাকে তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না? উত্তর দিতাম, অভিনেতারা ক্যামেরার সামনে বা স্টেজে না থাকলেও কাজ করে। কিন্তু ক্যামেরার সামনে বা স্টেজে অভিনয় করতে পারার যে আনন্দ, ওটাই আসল। আমার স্বপ্নটা খুব বেসিক। যেন অভিনয় করে যেতে পারি। যদি কেউ সুযোগ দেয় ভাল, নাহলে নিজেকেই কোমর বেঁধে নামতে হবে।
‘অনেকদিন পর’ ছবির মল্লিকা চিত্রাঙ্গদার কতটা মনের কাছাকাছি?
চিত্রাঙ্গদা: খুব সহজ, সরল চরিত্র। ঝগড়া, ঝামেলা, বিতর্কে থাকে না। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়। নরম স্বভাবের হলেও ব্যক্তিত্বময়ী। ছোট ছোট বিষয়ের গুরুত্ব আছে ওর কাছে। এদিক থেকে ওর সঙ্গে চিত্রাঙ্গদার মিল আছে। কিন্তু আমাদের সোশ্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদা। মল্লিকার চরিত্রটার জন্য আমাকে ভাবতে হয়েছে, ও কোথা থেকে আসছে, চিন্তাভাবনা কেমন, কীভাবে কথা বলে। এই ব্যাপারে সৌরভ খুব সাহায্য করেছে।
এই ছবিটা শুটিং-এর সময় তো আপনি প্রেগন্যান্ট ছিলেন? কীভাবে সামলালেন?
চিত্রাঙ্গদা: এনআইডিয়াস, সৌরভের টিম খুব খেয়াল রাখত। সাইকেল চালানো নিয়ে একটু চিন্তায় ছিলাম। অনেকবছর চালাইনি, আর এই ছবিতে সাইকেল মাস্ট। ওটাও একটা ক্যারেক্টার। প্রথমদিন তো খুব বেঁচে গিয়েছি।
কেন কী হয়েছিল?
চিত্রাঙ্গদা: প্রোডাকশনের একজনকে বলা হয়েছিল যখন সাইকেলে উঠব, পিছনদিক থেকে ধরে থাকতে। সে বুঝতে পারেনি, সাইকেলে উঠতে যাব, সেইসময় পিছনদিক থেকে ঠেলে দিয়েছে। কোনওরকমে পা দিয়ে ব্যালান্স করেছি। পড়ে গেলে খুব ক্ষতি হয়ে যেত। সবাই বিষয়টা নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। একবার বুম্বাদা ফোন করে ডাক্তার পাঠানোর কথা বলছেন, আবার বলছেন, ওকে আর সাইকেল চালাতে হবে না, ডামি দিয়ে শুট কর। সৌরভ তো ব্যালেন্স সাইকেল আনার কথাও বলেছিল। কিন্তু সেসব কিছু করতে হয় নি।
আপনি তো অরিজিৎ সিং-এর ছবিতে কাজ করলেন। পরিচালক অরিজিৎ সিং কেমন?
চিত্রাঙ্গদা: প্রথমে একটা কথাই বলতে হয়, উনি জানেন কী করছেন, কী চাইছেন। ওঁর প্রথম পরিচালনা, তখন পরিচালক হিসাবে অরিজিৎ-এর কোনও কাজই দেখিনি। কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম শুধু গান নয়, মানুষটা সব কাজের ক্ষেত্রেই পারফেকশনিস্ট। দাদা যে কতটা প্রতিভাবান এই কাজটা করতে গিয়ে বুঝলাম। সেট, কস্টিউম, ক্যামেরা সবটাই জানেন, বোঝেন।
বাংলা ছবি দেখেন, কী মনে হয়?
চিত্রাঙ্গদা: বেশ কিছু ভাল কাজ তো হচ্ছে। এখানে ছবিগুলো তখনই ওয়ার্ক করে, যখন সেটা অন্য ছবির মতো নয়, সাউথের, মুম্বইয়ের ছবির মত নয়। বাংলা ছবি দেখতে গিয়ে যদি মনে হয়, তেলেগু ছবিতে সবাই বাংলায় কথা বলছে, সেই ছবি কেন দেখবে? ছবিটাকেও বাঙালি হতে হবে। ছবির গল্পের সঙ্গে দর্শক যদি রিলেট না করতে পারে তাহলে কী করে ভাল লাগবে! ‘মানিকবাবুর মেঘ’ আমার খুব ভাল লেগেছে। ‘বহুরূপী’ও।















