বাঙালি আর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়— এক আবেগের চিরন্তন বাঁধন। কিন্তু চিরকাল রোমান্টিক ট্র্যাজেডির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া শরৎচন্দ্রের সেই বিপ্লবী, নির্ভীক রূপটিকে পর্দায় ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন টলিউডের ‘ফার্স্ট বয়’ সৃজিত মুখার্জি। চলতি বছরের শুরুতেই যে ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল জোরকদমে, সেই বহুপ্রতীক্ষিত ছবি ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ -এর প্রথম প্রি-টিজার অবশেষে প্রকাশ্যে আনল প্রযোজনা সংস্থা ‘নন্দী মুভিজ’ । আর তা সামনে আসতেই নেটপাড়ায় রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে।
৫৯ সেকেন্ডের এই রহস্যে মোড়া প্রি-টিজারটি শুরুই হচ্ছে একটি অত্যন্ত গম্ভীর ও রহস্যময় বার্তা দিয়ে— “কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না যে তিনি ঠিক কী— বা তিনি কী নন। এমনকি এত বড় এক সরকারও তাঁর ওপর কড়া নজর রাখতে গিয়ে পুরোপুরি খেই হারিয়ে ফেলেছিল।” ইতিহাস, সাহিত্য আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়ে তৈরি এই টিজার ইতিমধ্যেই সিনেমা প্রেমীদের মনে তুমুল কৌতূহল তৈরি করেছে।
প্রদীপ কুমার নন্দী প্রযোজিত এই ছবির মূল অনুপ্রেরণা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’। ১৯২৬ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত হওয়া এই বইটি তৎকালীন ব্রিটিশ শাসককে এতটাই কাঁপিয়ে দিয়েছিল যে, ১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসেই ইংরেজ সরকার এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
ছবির টিজারের পরতে পরতে ধরা পড়েছে পিরিয়ড ড্রামার ছোঁয়া। নদী তীরের এক নিঝুম বাড়িতে আলো-আঁধারির মাঝে এক লেখকের কলম চলার দৃশ্য, আর তার সমান্তরালে গোপন বিপ্লবী আন্দোলনের আবহ— স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ছবিটির ক্যানভাস কতটা চওড়া হতে চলেছে। এবং সেই ভিডিওতেও ধরা পড়েছে সৃজিত-সিগনেচার। তাই তো শরৎচন্দ্ররূপী টোটা রায়চৌধুরীকে ফোর্থ ওয়াল ভেঙে দর্শকের উদ্দেশ্যে খানিক মিহি গলায় বলতে শোনা গেল, “তাহলে দেখা হচ্ছে এবার পুজোয়। এবং সঙ্গে থাকুক সব্যসাচী...” বলতে বলতে জানলার বাইরে ট্যুইড জ্যাকেট, ফল্ট হ্যাটে 'সব্যসাচী'রূপী আবীর চট্টোপাধ্যায়কে দেখা গেল দু’হাতে বন্দুক নিয়ে।
ব্রিটিশরা তো সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখাও নিষিদ্ধ করেছিল, তবে কেন এই ছবির জন্য শরৎচন্দ্রকেই বাছলেন পরিচালক? এই প্রশ্নের উত্তরে নিজের অননুকরণীয় ভঙ্গিমায় সৃজিত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “সেই সময় শুধু বাংলার নয়, গোটা ভারতবর্ষের সবথেকে জনপ্রিয় লেখক ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। ওঁর লেখা থেকে মঞ্চসফল নাটক হচ্ছে, ছবি হচ্ছে, ওঁর লেখা নভেল ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে বেরোচ্ছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে... সেরকম সাফল্যের তূরীয় পর্যায়ে বসে সেই মানুষটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে গর্জে উঠছেন, সেটা ভীষণ ইন্সপায়ারিং!”
আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে ‘পথের দাবী’ উপন্যাস প্রকাশের ১০০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। তার ঠিক আগের বছর, অর্থাৎ চলতি বছর ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোতেই মুক্তি পেতে চলেছে ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’। শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণকে মাথায় রেখে সৃজিতের এই ছবি শুধু বিনোদন নয়, বরং বাঙালি সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে উঠতে চলেছে। ব্রিটিশ রাজশক্তি বনাম এক অপরাজেয় কলমের এই রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বড়পর্দায় কতটা ঝড় তোলে, এখন সেটাই দেখার।
















