মূলধারার বাংলা ছবির পাশাপাশি অন্যরকমের ছবি পরিচালনাতেও সিদ্ধহস্ত বিরসা দাশগুপ্ত। দু'দশক ধরে দর্শককে নানান স্বাদের ছবি উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে বিরসার পরিচালক হিসেবে যাত্রাটা কিন্তু শুরু হয়েছিল ছোটপর্দা থেকেই। টেলিফ্লিমের হাত ধরে। প্রায় কুড়ি বছর আগে নিজের প্রথম টেলিফ্লিম ‘একটি রোমহর্ষক ডাকাতির গল্প’ পরিচালনা করেছিলেন বিরসা। তা প্রথমবারের জন্য সম্প্রচার হয়েছিল অধুনালুপ্ত চ্যানেল তারা টিভি-তে।  ত্রিসূর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল সেই ছবি।  গদার-ট্যারান্টিনোর মতো পরিচালকদের ছবি থেকে অনুপ্রাণিত সেই ‘একটি রোমহর্ষক ডাকাতির গল্প’  ছবি দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষের মতো হেভিওয়েট পরিচালকেরাও। এবার সেই টেলিফ্লিমটি রেস্টোর করতে গিয়ে মুশকিলে পড়েছেন পরিচালক। এমনকী, ইউটিউবে সাধারণ দর্শকের জন্য সেই ঝকঝকে ভার্সনটি আদৌ রিলিজ করাতে পারবেন কি না তাই নিয়েও পড়েছেন সমস্যায়। ঠিক কী সমস্যা? সবকিছু নিয়েই রবিবার ফেসবুকে একটি নাতিদীর্ঘ পোস্ট করেছেন বিরসা। নেটপাড়ার আঁকছে রেখছেন প্রশ্ন, সমাধানের আশায়। 

 


ফেসবুকে বিরসা লিখছেন, “প্রায় কুড়ি বছর আগে আমি একটি টেলিফিল্ম বানিয়েছিলাম। নাম ‘একটি রোমহর্ষক ডাকাতির গল্প’। সময়টা ছিল ২০০৬ নাগাদ। প্রিমিয়ার হয়েছিল তারা টিভি চ্যানেলে। সেটাই ছিল আমার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফিকশন কাজ। টেলিভিশনের জন্য বানানো একটি ছোট ছবির পক্ষে যা প্রায় অকল্পনীয়, সেই ছবিটিই কোনওভাবে জায়গা করে নিয়েছিল ত্রিসূর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের তালিকায়। আজও ভাবলে মনে হয়, এটা একটা ছোট্ট অলৌকিক ঘটনা।

 

 

 

ওই সময়েই কলকাতার ম্যাক্স মুলার ভবনে টেলিফ্লিমটির একটি বিশেষ প্রদর্শনী হয়েছিল। দর্শকাসনে বসেছিলেন মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত, গৌতম ঘোষ...এমন আরও বহু কিংবদন্তি। তাঁরা মন দিয়ে ছবিটা দেখলেন। প্রদর্শনীর পর তাঁদের বলা কয়েকটি প্রশংসার কথা আমার কাছে আজও অবিশ্বাস্য লাগে। মাঝ কুড়ির বয়সের এক চলচ্চিত্রকার, যে তখনও নিজের জায়গা খুঁজে চলেছে, তার জন্য সেই সন্ধেটা ছিল ঠিক সেই ধরনের স্মৃতি, যা জীবনের গভীরে কোথাও স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।

 

বলা হয়, “ প্রথম আঘাতের ক্ষতটা সবথেকে গভীর হয়”, আর ফিকশনের জগতে আমার প্রথম পা রাখার মুহূর্তে আমার ভেতরে একটা অদম্য ইচ্ছে কাজ করছিল, আমার চিরকালের প্রিয় দুই গুরু, জঁ-লুক গদার আর কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনো-কে শ্রদ্ধা জানানোর। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘একটি রোমহর্ষক ডাকাতির গল্প’। গদার ছিল তার হৃদস্পন্দনে, ট্যারান্টিনো ছিল তার স্পন্দনে। ছবিটা বলেছিল কিছু বহিরাগত মানুষের গল্প, যারা জীবনে একবার বাজি রেখে পাল্টে যেতে চেয়েছিল নিজেদের নিয়তি। পাল্প-ফিকশন-এর রোম্যান্টিক দুনিয়ায় কিছু স্বপ্নবাজ নির্বোধ, যারা শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, নিজেদের ভেতরের টিমটিম করা স্বপ্নের জন্যও ছুটে চলেছিল।

 

বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, পুরো ছবিটা তৈরি হয়েছিল মাত্র দেড় লাখ টাকা বাজেটে। হ্যাঁ, এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। রুদ্রনীল ঘোষ, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, সুপ্রিয় দত্ত, ছন্দা চ্যাটার্জি, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়-মূল অভিনয়শিল্পীরা কেউই পারিশ্রমিক নেননি। চিফ ক্রুর অবস্থাও একই। লেখক অংশুমান চক্রবর্তী, ডিওপি সৌমিক হালদার, সুরকার দ্রোণ আচার্য, সম্পাদক সুজয় দত্ত রায়, শিল্প নির্দেশক অমিত চ্যাটার্জি...সবার একটাই বিশ্বাস ছিল - পারস্পরিক সহমর্মিতা আর সিনেমার প্রতি ভালবাসা।

প্রতিটা টাকা খরচ হয়েছিল যন্ত্রপাতি ভাড়া, প্রপস ও পোশাক, লোকেশন, ইউনিটের খাওয়া-দাওয়া ও যাতায়াত, চার দিনের টানা শুটিংয়ে টেকনিশিয়ানদের পারিশ্রমিক, আর যেভাবে হোক পোস্ট-প্রোডাকশন শেষ করার পেছনে। এত অল্প দিয়ে তৈরি হওয়া সেই ছবিটাই আজ আমার চলচ্চিত্র-জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুরু হয়ে রয়ে গেছে।

 

সংক্ষিপ্ত করে বললে, কিছুদিন আগে বাড়ির পুরোনো হার্ডড্রাইভ ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎই আমি একটি এমপিফোর (MP4) ফাইল খুঁজে পেলাম- ‘একটি রোমহর্ষক ডাকাতির গল্প’। মুহূর্তের মধ্যে স্মৃতিরা এসে ভিড় করল। এতদিন ধরে ছবিটা খুঁজেছি, আর যেদিন খোঁজা বন্ধ করলাম, সেদিনই যেন ও নিজে থেকে ফিরে এল-নিছক কাকতালীয়।

 

এখন আমি চাই ছবিটাকে রিস্টোর করতে। ছবির প্রতিটি শব্দকে নতুন করে জীবিত করতে, ছবির গুণমান একটু ঝালিয়ে নিতে, ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো জুড়ে তাকে একটা সম্পূর্ণ রূপ দিতে। তারপর সেটাকে ইউটিউবে আপলোড করতে চাই। কিন্তু মাথায় ঘুরছে একটা প্রশ্ন, এই ছবির স্বত্বাধিকার এখন কার হাতে? তারা টিভি তো বহু আগেই বন্ধ। কার কাছে অনুমতি চাইব, সেটাই তো জানি না।

আমার চাহিদা খুব সাধারণ। কোনও লাভের উদ্দেশ্য নেই। শুধু চাই, আমার প্রথম ফিকশন ছবিটা আবার নিঃশ্বাস নিক। জনসাধারণের মাঝে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে। কোনও লাভের কড়ি কামানোর উদ্দেশ্যে নয়। চাই, যাতে সেই সময়ের বেড়াজালের মধ্যে সেই সময়ের এই স্মৃতি আর স্পিরিটটা বেঁচে থাকে।”