নিউ ইয়র্কের বুকে তখন যেন নেমে এসেছে শান্তিনিকেতনের ছোঁয়া। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নিউইয়র্কের জুইস সেন্টারে সম্প্রতি আয়োজিত হয়ে গেল এক মায়াবী সাংস্কৃতিক মহোৎসব—‘আনন্দসন্ধ্যা’। আটলান্টিকের ওপারে বাংলা সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রচর্চার দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখতে এই বিশেষ উদ্যোগ। সুর, ছন্দ আর অনন্য এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির হাত ধরে এই সন্ধ্যা হয়ে উঠল প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।


অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন উপমহাদেশের দুই প্রজন্মের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র—কিংবদন্তি রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং স্বপ্নীল সজীব। তাঁদের কণ্ঠে যখন রবিঠাকুরের কালজয়ী গানগুলো একে একে ভেসে আসছিল, তখন উপস্থিত শ্রোতারা নিমেষের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলেন নিজেদের শিকড়ে। সুরের এই জাদুতে যোগ্য সংগত দিল নন্দিত নৃত্যশিল্পী রাসেল আহমেদের একক নৃত্য পরিবেশনা। তাঁর নান্দনিক ছন্দের ম্যাজিক উপস্থিত দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রেখেছিল।

 


এই সন্ধ্যার সবচেয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি এল যখন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানী মঞ্চে এসে দুই শিল্পীর হাতে বিশেষ সম্মাননা সার্টিফিকেট তুলে দিলেন। বাংলা সংস্কৃতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং বাঙালির শাশ্বত ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সগৌরবে তুলে ধরার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, নিউইয়র্কের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মেয়রের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীদের এমন রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করা হল, যা অনুষ্ঠানটিতে এক ঐতিহাসিক মাত্রা যোগ করেছে।


রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বললেন, "রবীন্দ্রনাথের গান কেবল সঙ্গীত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের ধারক। প্রবাসের মাটিতে তাঁর সৃষ্টিকে ঘিরে এমন আন্তরিক আয়োজন এবং এই সম্মাননা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।" অন্যদিকে, স্বপ্নীল সজীব বললেন, "রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। নিউইয়র্ক সিটির এই সম্মাননা আমার শিল্পীজীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।"


এই সফল অনুষ্ঠানের নেপথ্যে ছিল আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাবাউট টাইম ইভেন্টস’। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ওয়ালীউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানান, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাঙালি, যারা হয়তো বাংলা থেকে দূরে থাকে, তাদের কাছে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য।


অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। "পুরানো সেই দিনের কথা" গানের সুরে যখন বন্যা ও স্বপ্নীল গলা মেলালেন, তখন প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত শত শত প্রবাসী বাঙালিও আবেগঘন হয়ে একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন। সেই যৌথ কণ্ঠের জাদুকরী মুহূর্তের একটি ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল ভাইরাল। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালবাসা কুড়োচ্ছে প্রবাসের মাটির এই খাঁটি বাঙালি আবেগের কোরাস।