টলিপাড়ার চিরকালীন ‘এভারগ্রিন বিউটি’ এবং ডাকসাইটে সুন্দরী অভিনেত্রী মুনমুন সেন। আশির ও নয়ের দশকে ওঁর গ্ল্যামার, সাহসিকতা আর আভিজাত্য বাঙালি দর্শকদের মনে ঝড় তুলেছিল। তবে শুধু রূপ নয়, ওঁর কাজের ধারাও ছিল বাকি পাঁচজন অভিনেত্রীর থেকে আলাদা। আর এবার সেই সুচিত্রা-কন্যা মুনমুন সেনেরই এক আজব এবং রুদ্ধশ্বাস গোপন কীর্তি ফাঁস করলেন টলিপাড়ার প্রখ্যাত অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী ।
দীর্ঘ কয়েক বছর বড়পর্দা থেকে দূরে থাকার পর গত মে মাসেই ‘উইন্ডোজ প্রোডাকশন’-এর হাত ধরে ধামাকাদার কামব্যাক করেছেন অর্জুন। নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছে ওঁর নতুন ছবি ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’। এই ছবিতে বর্ষীয়ান অর্জুনের বিপরীতে অভিনয় করেছেন মুনমুন-কন্যা রাইমা সেন। আর এখানেই লুকিয়ে এক মিষ্টি সমাপতন! এক সময় যে মুনমুন সেনের সঙ্গে একের পর এক জনপ্রিয় ছবি ও সিরিয়ালে দাপিয়ে রোম্যান্স করেছিলেন অর্জুন, ২০২৬ সালে এসে তিনি অন-স্ক্রিন রোম্যান্স করলেন ওঁর মেয়ের সঙ্গে! অর্থাৎ মা ও মেয়ে— দুই প্রজন্মের সাথেই হিরো হওয়ার এক বিরল রেকর্ডের মালিক হলেন তিনি।
সম্প্রতি আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে রাইমার মায়ের সাথে ওঁর বহু বছরের পুরনো বন্ধুত্বের ডায়েরি ওল্টালেন অর্জুন। আর তখনই সামনে এল এক অবিশ্বাস্য সত্য, যা শুনলে যেকোনো মানুষের মুনমুন সেনের প্রতি শ্রদ্ধা এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
মুনমুনের রূপ ও গুণের প্রশংসা করে অর্জুন চক্রবর্তী বলেন, “মুনমুন ওঁর পিক সময়ে যেমন সুন্দর ছিল, তা যাঁরা দেখেছেন তাঁরাই জানেন। ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ালেই চারপাশটা আলো হয়ে যেত... একটা সফ্ট বিউটি। ভীষণ সুন্দরী ছিল মুনমুন। আর মানুষ হিসেবেও ততটা ভাল, উদার। অসম্ভব পড়াশোনা ওঁর। কত বিষয়ে যে মুনমুনের সঙ্গে আড্ডা মারা যায়, ভাবতে পারবেন না। মুনমুন কিন্তু একটা সময় চমৎকার ছবিও আঁকত!”অর্জুন জানান, গ্ল্যামারাস ইমেজের আড়ালে মুনমুন আসলে সম্পূর্ণ অন্যরকম, বাকি পাঁচজনের থেকে আলাদা একটা মানুষ ছিলেন। আর সেটা বোঝাতেই তিনি তুলে ধরেন বহু বছর আগের এক চমকে দেওয়া সত্য ঘটনা।
ঘটনাটি বহু বছর আগের। টালিগঞ্জের উত্তমকুমারের মূর্তির সামনে মেগা ধারাবাহিক ‘আলেয়া’-র শুটিং চলছিল। অর্জুন চক্রবর্তী এবং মুনমুন সেন ছিলেন সেই ধারাবাহিকের প্রধান দুটি মুখ্য চরিত্রে। সাথে ছিলেন অভিনেত্রী মৌলি গাঙ্গুলিও।হঠাৎ করেই লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের মাঝে হুলুস্থুল পড়ে গেল সেটে। কারণ, প্রধান নায়িকা মুনমুন সেন সেটে নেই! ‘কোথায় গেল? কোথায় গেল?’ রব উঠল চারদিকে। পরিচালক থেকে স্পটবয়— সবার তখন পাগল-পাগল অবস্থা। কারণ আফটার অল, তিনি মুনমুন সেন! তখন ওঁর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, তাই ওঁর নিরাপত্তার চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
অর্জুনের কথায়, “হঠাৎ করে আমার চোখে পড়ল বেশ খানিকটা দূরে, একটি গাছের ঘন ছায়ায় একটা রিকশার মধ্যে বসে রয়েছে মুনমুন! মুখে ওড়না পেঁচানো, তাই কেউ চট করে চিনতে পারছে না ওকে। আমি তো দেখেই দে ছুট! মুনমুনের কাছে গিয়েই ওকে বললাম— এই কী করছিস? কোথায় যাচ্ছিস? তোকে সবাই গরু খোঁজার মতো খুঁজছে...। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মুনমুন বলল— উঠে এস রিকশায়। চুপচাপ। কোনও কথা বলবে না।”
বিস্ময়ভাব তখনও কাটেনি অভিনেতার। এদিকে মুনমুন ডাকছে, না-ও করা যায় না। উঠলাম। রিকশা চলতে শুরু করল। এদিক-ওদিক গিয়ে তা থামল টালিগঞ্জ ব্রিজের নীচে। বিস্ময় নিয়েই অর্জুন রিকশায় উঠে বসলেন। রিকশা চলতে চলতে গিয়ে থামল টালিগঞ্জ ব্রিজের নিচের এক অন্ধকার গলিতে, যা ছিল তৎকালীন সময়ের একটি মিনি রেড লাইট এরিয়া বা যৌনপল্লী। অর্জুন তো অবাক! রিকশা থেকে নেমেই মুনমুন সেন ওখানকার যৌনকর্মীদের নাম ধরে একে-একে ডাকা শুরু করলেন— ‘এই ছন্দা! এই রূপা! কোথায় রে তোরা?’
অর্জুন জানান, ওঁর চোখের সামনে যা ঘটছিল তা ওঁর বিশ্বাসের বাইরে ছিল। গ্ল্যামার দুনিয়ার টপ কুইন মুনমুন সেন যৌনপল্লীর মাঝে দাঁড়িয়ে ওখানকার মেয়েদের নাম ধরে ডাকছেন, আর ওরাও ‘দিদি’ বলে ছুটে এসে চারিদিকে ভিড় জমিয়ে দিল! মুনমুন হাসিমুখে অর্জুনের পরিচয় করিয়ে দিলেন সবার সঙ্গে।
এরপরই অর্জুন যা দেখলেন, তাতে ওঁর মাথা নত হয়ে গেল। অর্জুনের কথায়, “একটু পর দেখলাম মুনমুন নিজের ব্যাগ থেকে মুঠো-মুঠো টাকা বের করছে। ওখানে কার ছেলে-মেয়ের স্কুলের খরচ লাগবে, কার খাতা-পেন্সিলের টাকা চাই, কার মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে হবে— সব নখদর্পণে মুনমুনের! সেই বুঝে ডেকে ডেকে তাদের মায়েদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে ও। ভাবা যায়! আর মুনমুন ওদের দিদি। দিব্যি খোশগল্প চলছে। সেদিন ঘণ্টা দেড়েকের মতো ছিলাম আমরা ওখানে। আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।”
বর্ষীয়ান অভিনেতার মতে, আজকের যুগে তারকারা সামান্য সামাজিক কাজ করলেই যেখানে ক্যামেরা আর পিআর এজেন্সির বন্যা বয়ে যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে মুনমুন সেনের এই রূপ ছিল একেবারে আলাদা। অর্জুন চক্রবর্তী বললেন, “মনে রাখবেন, তখন কিন্তু এই পাপরাজ্জি সংস্কৃতি ছিল না। তারকাদের ডেকে ডেকে ছবি তোলানোরও কোনও হিড়িক ছিল না। আর মুনমুন সেসব তো কোনওদিন পরোয়াও করত না। সেদিনও ওই ঘটনার পর শুটিংয়ে ফিরে আর একটি বাক্যও তা নিয়ে খরচ করেনি মুনমুন। ওর কাছে এটা ছিল একদম স্বাভাবিক একটা বিষয়...ফর হার ইট ওয়াজ লাইক ওয়ান ইন দ্য পার্ক।। সেই যে মুনমুনকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে চিনলাম, ওঁর সেই রূপটা আজও মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি আমি।















