তানিম নূর পরিচালিত এবং সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ছবি বনলতা এক্সপ্রেস’ -এর দুটি পৃথক প্রদর্শনী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জেলার ১০টি শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন। সোমবার (এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর এবং কসবা উপজেলায় পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিকে ভুলভাবে ব্যবহার করে এবং প্রশাসনের অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী বন্ধ করা হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বলা হয় -
১. ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর: ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে গত ৩০ মে শহরের ঐতিহ্যবাহী অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার একটি বিশেষ প্রদর্শনীর কথা ছিল। এর জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগে থেকেই লিখিত অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, একদল স্বার্থান্বেষী মানুষ ধর্মীয় অনুভূতিকে হাতিয়ার করে এবং সেটিকে সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সিনেমাটির বিরুদ্ধে কুৎসিত প্রচার শুরু করে। এর জেরে শেষ মুহূর্তে অন্নদা স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের অনুমতি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
২. কসবা উপজেলা: একই দিনে (৩০ মে) কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামে ছবিটির আরও একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের ‘অনভিপ্রেত ও অযাচিত’ হস্তক্ষেপের কারণে প্রদর্শনীটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বরাবরই উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং কবি আল মাহমুদের মতো বিশ্বখ্যাত মণীষীদের জন্মভূমি, যা চিরকাল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সুস্থ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই ভূমিপুত্র ও কৃতি পরিচালক তানিম নূরের তৈরি একটি চলচ্চিত্র ওঁর নিজের পৈতৃক শহরেই প্রদর্শিত হতে পারল না।” উদ্যোক্তারা মনে করিয়ে দেন যে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবিটি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন ২০২৩ (Bangladesh Film Certification Act 2023)-এর অধীনে যথাযথভাবে সেন্সর সার্টিফিকেট পেয়েছে এবং ইতিপূর্বে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে। সিনেমা সমাজবাস্তবতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়, তাই একে এভাবে বাধা দেওয়া আন্তর্জাতিক শিল্পরীতির পরিপন্থী।
বিবৃতিতে একটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের উদাহরণ টেনে বলা হয়, কিছুদিন আগেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওঁর কন্যাসন্তানকে নিয়ে ঢাকার একটি প্রেক্ষাগৃহে সপরিবারে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই পদক্ষেপ চলচ্চিত্র এবং সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার প্রতি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, “যখন দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংস্কৃতির পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তখন কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর চলচ্চিত্রের প্রতি এমন বৈরী ও আক্রমণাত্মক মনোভাব কোনোভাবেই কাম্য বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।” তাঁরা যেকোনও মূল্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনরুল্লেখ করেন।
এই যৌথ প্রতিবাদী বিবৃতিতে যে ১০টি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ১০টি সংগঠন স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো হল—
১. ব্রাহ্মণবাড়িয়া অনুশীলন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
২. খেলাঘর আসর
৩. উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী (জেলা সংসদ)
৪. জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটি)
৫. বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
৬. আবরনী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র
৭. সাহিত্য সংগঠন ‘কবির কলম’
৮. চারণ
৯. সোনালী সকাল
১০. আজকের সংস্কৃতি সংগঠন।















