আজকাল ওয়েবডেস্ক:  ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা শুরু। বাংলার আকাশে-বাতাসে চেনা এক লড়াইয়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এবারের লড়াই শুধু রাজনৈতিক মঞ্চে বা জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে পাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে ফেসবুকের দেওয়ালে। কাটোয়া থেকে মধ্যমগ্রাম, আর চন্দ্রকোণা থেকে গ্রাম-বাংলার প্রত্যন্ত পকেট— সর্বত্রই এখন সাজ সাজ রব। একদিকে যখন ডিজিটালি ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘দেওয়াল লিখন’ সংস্কৃতিও নতুন মোড়কে ফিরে আসছে। এক সময়ের সেই চুন-কাম আর রঙের গন্ধ যেন ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে, ভোট মানেই বাংলার দেওয়ালে শিল্পের ছোঁয়ায় রাজনীতির কাটাছেঁড়া। এই ‘দেওয়াল লিখন’ সংস্কৃতি নিয়েই বিশেষ প্রতিবেদন করেছে ন্যাশনাল হেরাল্ড।

একটা সময় ছিল যখন বাংলার ভোট মানেই ছিল দেওয়াল জুড়ে বড় বড় হরফে স্লোগান, চটজলদি ছড়া আর কার্টুন। আজ সেই জায়গা অনেকটা দখল করেছে ফ্লেক্স, ব্যানার আর সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস। কিন্তু তবুও দেওয়াল লিখনের সেই পুরনো আবেগ আজও অমলিন। ন্যাশনাল হেরাল্ডকে বামপন্থী কর্মী জয়িতা কুণ্ডু জানান, দেওয়াল শুধু একটা ইটের গাঁথনি নয়, এটা একটা পাড়ার রাজনৈতিক পরিচিতি। একটি রং করা স্লোগান যেমন বিতর্ক উস্কে দিতে পারে, তেমনই পথচলতি মানুষের মুখে হাসিও ফোটাতে পারে। তাই ডিজিটাল যুগেও এর গুরুত্ব কমেনি।

এই গুরুত্বের প্রমাণ তুলে এনেছে বিশেষ প্রতিবেদনটি, মধ্যমগ্রামের মাইকেল নগরে, যেখানে দেওয়াল দখলকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে রীতিমতো ‘দেওয়াল চুরির’ অভিযোগ উঠেছে। যশোহর রোডের ধারে কিছু দেওয়াল সাদা করে প্রচার শুরু করেছিল বিজেপি, কিন্তু পরে দেখা যায় সেখানে তৃণমূল প্রার্থীর নাম লেখা হয়েছে। এই নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে ওঠে। বিজেপি যখন বিষয়টিকে প্রশাসনের নজরে আনার কথা বলে, তৃণমূল তখন সাফ জানায় বাড়ির মালিকের অনুমতি ছাড়া তারা কোনও দেওয়ালে হাত দেয় না। এই বিতর্কই স্পষ্ট করে দেয় যে, ডিজিটাল প্রচারের ভিড়েও এক ইঞ্চি দেওয়ালের দখল নিতে রাজনৈতিক দলগুলি কতটা মরিয়া।

অন্যদিকে, চন্দ্রকোণা-২ ব্লকের ছবিটা একটু অন্যরকম। সেখানে দেওয়াল যেন এক একটা মুক্ত আর্ট গ্যালারি। বিশেষ করে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে সেখানে ব্যঙ্গচিত্র আর ছড়ার ছড়াছড়ি। তৃণমূলের প্রচারে উঠে আসছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী বা কৃষক বন্ধুর মতো সরকারি প্রকল্পের খতিয়ান। আবার কাটোয়াতে দেখা যাচ্ছে এক উল্টো চিত্র। সেখানে ফ্লেক্স বা ব্যানারের চেয়েও দেওয়াল লিখনের চাহিদা বেড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, প্লাস্টিকের ফ্লেক্সের বদলে দলগুলো এখন রঙের ওপর বেশি ভরসা করছে। শিল্পী বাপ্পাদিত্য সেনের মতে, কালবৈশাখীর ঝড়ে ফ্লেক্স ছিঁড়ে যেতে পারে, কিন্তু দেওয়ালের রং সহজে মোছে না। তাছাড়া দেওয়াল লিখনে স্থানীয় আবেগ মিশিয়ে সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগ থাকে অনেক বেশি।

প্রতিবেদন মতে, পরিবেশকর্মী স্বাগতা নন্দী এই প্রবণতাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাঁর মতে, ফ্লেক্সের ব্যবহার কমলে প্লাস্টিক দূষণ কমবে, যা পরিবেশের জন্য মঙ্গলজনক। ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে যে দেওয়াল লিখনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তা আজ আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। একদিকে যেমন দলগুলোর আইটি সেল রাতদিন কাজ করছে, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে মিমের লড়াই। এমনকি প্রচারের অভিনবত্বে তৃণমূল নিয়ে এসেছে বিশেষ ‘লুডো’, যেখানে মই আর সাপের ঘরগুলো সাজানো হয়েছে রাজনৈতিক ইশারা দিয়ে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর নির্বাচনী রণকৌশলে বাংলা এখন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে যখন সেকেন্ডে সেকেন্ডে রাজনৈতিক বার্তা বদলাচ্ছে, তখন পাড়ার মোড়ের দেওয়ালে আঁকা সেই ব্যঙ্গচিত্রটি আজও মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করছে। বাংলার মাটির এই চিরাচরিত প্রচার শৈলীই সম্ভবত বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, মাধ্যম যাই হোক না কেন, মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছানোর শিল্পটা আজও এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ডিএনএ-তে মিশে আছে।