আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভোটের মরশুম মানেই রাজনীতির উত্তাপ তুঙ্গে। মাঠে-ময়দানে প্রচারের পাশাপাশি সমান তালে সরগরম হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্রিন্টিং ছাপাখানাগুলিও। রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এখন ডিজিটাল ফ্লেক্স ও ব্যানার। ফলে ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই কাজের চাপে দম ফেলার ফুরসত নেই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের। ব্যস্ততার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এই শিল্প। যেখানে সময় যেন থেমে থাকার সুযোগই পাচ্ছে না।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর এলাকায় একাধিক ডিজিটাল প্রিন্টিং ছাপাখানায় এখন কার্যত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সকাল থেকে গভীর রাত—কখনও বা ভোর পর্যন্ত টানা চলছে মেশিনের ঘড়ঘড় শব্দ। বড় বড় প্রিন্টিং মেশিন এক মুহূর্তের জন্যও থামছে না। কর্মীদের নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই, নেই বিশ্রামের সুযোগও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের ছবি, প্রতীক ও স্লোগান দিয়ে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য ব্যানার ও ফ্লেক্স, যা পরে ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে শহরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে।

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রিন্টিং ভোট প্রচারের এক অত্যন্ত কার্যকরী ও জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রঙিন, বড় আকারের এবং চোখে পড়ার মতো এই ফ্লেক্স ব্যানার সহজেই মানুষের নজর কাড়ে। ফলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই প্রচারের ক্ষেত্রে এই মাধ্যমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিএম থেকে শুরু করে বাকি দলগুলি—প্রতিটি দলের অর্ডারে এখন ডুবে রয়েছে জয়নগরের ছাপাখানাগুলি। ছোট, বড় সব প্রেসেই একই চিত্র—অর্ডারের চাপ, ডেডলাইনের দৌড় আর অবিরাম কাজের গতি। 

তবে কাজের এই চাপ বাড়লেও ব্যবসায়ীদের মুখে ততটা হাসি নেই। জয়নগরের এক ছাপাখানার মালিক শাহাবুদ্দিন ঢালী জানালেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে কাঁচামালের দাম অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। ফ্লেক্স তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ভিনাইল, ইঙ্ক ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় খরচও বেড়েছে। অথচ ভোটের সময় প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে অনেক ক্ষেত্রেই সারা বছরের দামের থেকেও কম দামে আমাদের কাজ নিতে হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাঁচামাল সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। বাইরে থেকে সময়মতো মাল আসছে না। ফলে অর্ডার অনুযায়ী কাজ শেষ করা এবং সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত পরিশ্রমের পরও লাভের অঙ্কটা আশানুরূপ হচ্ছে না, বরং ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।”
অন্যদিকে, কর্মীদের ওপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। এক কর্মী শামীম আহমেদ গায়েন জানান, “দিনরাত এক করে কাজ করতে হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ওভারটাইম করতে হচ্ছে। কখনও কখনও ১২-১৪ ঘণ্টা টানা কাজ করতে হচ্ছে। এত অর্ডার যে থামার সুযোগ নেই। তবে কাঁচামালের দাম বাড়ায় ফ্লেক্সের দামও কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু সেই বাড়তি দাম সব সময় গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা যাচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, “এই কাজ মূলত নির্বাচন পর্যন্তই চলবে। ভোট মিটে গেলে আবার কাজ কমে যায়। যদি সারা বছর এই কাজের ধারাবাহিকতা থাকত, তাহলে অনেক বেকার যুবকের রোজগারের সুযোগ তৈরি হত। এখন এই কয়েক মাসই আমাদের আয়ের প্রধান ভরসা।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, আগের তুলনায় ডিজিটাল ফ্লেক্সের চাহিদা কিছুটা কমলেও নির্বাচনের সময় তা সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় এবং কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় মুনাফার আশা করতে পারছেন না। বরং অনেকেই আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত খরচের চাপে এই ব্যস্ত মরশুমেও লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে, ভোটের মরশুমে রাজনৈতিক উত্তাপ যেমন চরমে, তেমনি তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ডিজিটাল প্রিন্টিং শিল্পে। একদিকে অর্ডারের চাপ ও কাজের ব্যস্ততা, অন্যদিকে বাড়তি খরচ ও অনিশ্চিত লাভ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দিন কাটাচ্ছেন ছাপাখানার মালিক ও কর্মীরা। তবুও তাঁদের আশা, নির্বাচনের এই ব্যস্ততা কিছুটা হলেও আর্থিক সঙ্কট কাটাতে সাহায্য করবে এবং আগামী দিনে এই শিল্প আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে।