আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিউ ইয়ার্স ইভে যখন শহরজুড়ে আলো ছিল, অর্ডারের সংখ্যা রেকর্ড ছুঁচ্ছিল, তখনই ভারতের গিগ অর্থনীতি নিয়ে তৈরি হল নতুন সংঘাত। ফুড ডেলিভারি ও কুইক-কমার্স প্ল্যাটফর্মের ডেলিভারি পার্টনাররা বেতন, নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ নিয়ে প্রতিবাদের ডাক দেন। ঠিক সেই সময়েই অ্যাপগুলি ব্যস্ত ছিল ১০ মিনিটে বাজার নিয়ে।
ভোক্তাদের কাছে এই বিতর্ক সাময়িকভাবে হলেও সমস্যায় ফেলেছিল। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য এটি ছিল অনেক গভীর এক প্রশ্ন। কারা বেশি ক্ষতিতে রয়েছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় ব্লিঙ্কিট, ইনস্টামার্ট ও জেপ্টোর মতো কুইক-কমার্স প্ল্যাটফর্মে কাজ করা ডেলিভারি পার্টনারদের অভিযোগ থেকে। তাঁদের দাবি, ইনসেনটিভ কমে যাচ্ছে, অ্যালগরিদমের চাপ বাড়ছে, আর দ্রুত ডেলিভারির লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে রাস্তার নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, অতি দ্রুত ডেলিভারির সময়সীমা কার্যত রাইডিংকে উৎসাহিত করে, অথচ ন্যূনতম মজুরি বা চাকরির নিরাপত্তা না থাকায় অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেশনের মাধ্যমে হঠাৎ করেই রোজগার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নিউ ইয়ার্স ইভে সাধারণত যে ইনসেনটিভ থাকে, তার বাইরে অতিরিক্ত কিছু দেওয়া হয়নি। গিগ অর্থনীতি স্বভাবতই শোষণমূলক। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা আসলে বৈষম্য কমাবে না, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা কেড়ে নেবে।
গিগ কাজ নিয়ে অস্বস্তির মূল কারণ হল এর প্রত্যক্ষ প্রভাব। গিগ অর্থনীতি ভোক্তা শ্রেণি এবং শ্রমজীবী দরিদ্রদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে ভারতের দ্রুত বেড়ে ওঠা গিগ কর্মশক্তি। শ্রম মন্ত্রকের নথি ও নীতিগত রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮০ লক্ষ গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মী রয়েছেন, এবং এই সংখ্যা আগামী দিনে আরও দ্রুত বাড়বে। দশকের শেষে কর্মশক্তির একটি বড় অংশ গিগ কর্মী হতে পারে।
নিতি আয়োগের এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, গিগ কর্মীদের আয়ের অস্থিরতা অত্যন্ত বেশি। মাসিক আয় স্থিতিশীল মনে হলেও, জ্বালানির খরচ, গাড়ি ভাড়া, কাজের ফাঁক এবং ইনসেনটিভ কাঠামোর ঘনঘন পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত আয় অনেকটাই ওঠানামা করে। নির্দিষ্ট মজুরি বা কাজের সময় না থাকায় অর্থনৈতিক ধাক্কায় এই কাজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
নিরাপত্তাও বড় প্রশ্ন। শ্রম ও পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ডেলিভারি রাইডারদের সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি, যার একটি কারণ সময়ভিত্তিক ইনসেনটিভ ও কঠোর ডেলিভারি সময়সীমা।
তবুও সরকারি সমীক্ষা বলছে, গিগ অর্থনীতি একটি বড় কর্মসংস্থান বাফার হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে মহামারির পরবর্তী সময়ে। বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও একই সঙ্গে স্থায়ী অনিশ্চয়তা—এই দ্বৈত বাস্তবতাই আজ ভারতের গিগ অর্থনীতি বিতর্কের কেন্দ্রে।
