আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইক্যুইটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা চরমে। মার্চ মাসে মিউচুয়াল ফান্ডের এসআইপি (সিস্টেম্যাটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান) বন্ধ করার অনুপাত ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। এমনকি যখন তহবিলের নিট প্রবাহ রেকর্ড উচ্চতায় অবস্থান করছিল তখনই এই অবস্থা। বর্তমানে, একটি নতুন এসআইপি খোলা হলে, একটি করে এসআইপি বন্ধও করে দেওয়া হচ্ছে। মধ্য এশিয়ায় সংঘাতের আগে ফ্রেব্রুয়ারি মাসে এই হার তুলনায় কম ছিল।
এসআইপি বন্ধ করার এই হিড়িকের মূল কারণ হল বাজারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত হতাশাজনক বা মন্থর মুনাফা। ইক্যুইটি বাজার, আর্থিক সম্পদের তুলনায় বেশি মুনাফা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে মুনাফার হার কম হলেও, স্থিতিশীল বিনিয়োগ স্কিম, যেমন- ফিক্সড ডিপোজিটে বিনিয়োগে আস্থা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের।
যদিও বিপুল সংখ্যক এসআইপি সাময়িকভাবে স্থগিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, তবুও বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা তাদের অবস্থানে অটল রয়েছেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় মার্চ মাসের নিট প্রবাহের পরিসংখ্যানে। AMFI-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ইক্যুইটি স্কিমগুলোতে মোট ৪০,৩৬৬ কোটি টাকার নিট প্রবাহ এসেছে, যা ফেব্রুয়ারি মাসের ২৫,৯৬৫ কোটি টাকার তুলনায় এক বিশাল বৃদ্ধি (প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি)।
এসআইপি-এর মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিমাণও এক মাস আগের ২৯,৮৪৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩২,০৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তবে, তহবিলের প্রবাহে এই বিপুল বৃদ্ধি সত্ত্বেও মিউচুয়াল ফান্ডের মোট সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি। মার্চ মাসে মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের মোট সম্পদ বা AUM (Assets Under Management) কমে ৭৩.৭৩ লক্ষ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। যা ফেব্রুয়ারি মাসের ৮২.০৩ লক্ষ কোটি টাকার তুলনায় ১০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস। ইক্যুইটি বাজারে সামগ্রিক দরপতন বা 'কারেকশন'-এর ফলে সৃষ্ট 'মার্ক-টু-মার্কেট' ক্ষতির কারণেই মূলত সম্পদের এই পতন ঘটেছে।
গত দেড় বছর ধরে শেয়ার বাজার মূলত একটি 'একত্রীকরণ বা কনসলিডেশন' সীমার মধ্যেই ওঠানামা করছে। বাজারের অন্যতম প্রধান সূচক 'নিফটি ৫০' গত এক বছরে মাত্র ২ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যা বাজারের গতিপ্রকৃতি বা 'মোমেন্টাম'-এর দুর্বল অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
বাজারের এই দুর্বল পারফরম্যান্সের অন্যতম প্রধান কারণ হলো FII বা 'বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের' (Foreign Institutional Investors) পুঁজি প্রত্যাহার বা বহিঃপ্রবাহ। গত দেড় বছর ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ার বাজারের অত্যধিক মূল্যায়ন এবং বিশ্বের অন্যান্য বাজারে বিনিয়োগের অধিকতর আকর্ষণীয় সুযোগের কারণে ভারত থেকে তাদের পুঁজি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।
ইরান ওআমেরিকার মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর এই পুঁজি প্রত্যাহারের গতি আরও তীব্র হয়েছে। শুধুমাত্র মার্চ মাসেই FII-রা ভারতীয় ইক্যুইটি বাজার থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ তুলে নিয়েছেন। কারণ অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, টাকার (মুদ্রার) মান কমে যাওয়া এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব- ইত্যাদি কারণে দেশের অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল। যদিও বিনিয়োগকারীরা বাজারের অবস্থা খারাপ হলে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করেন, এই পদ্ধতিটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বলে মনে হয়। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, মন্দা বাজার বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে উর্বর এবং লাভজনক ক্ষেত্র তৈরি করে, যা তাদের অনেক ভাল মূল্যায়নে শেয়ার কেনার সুযোগ করে দেয়।
তারা বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডের এসআইপি তুলে নেওয়া বা বন্ধ করে দেওয়া ভাল পদক্ষেপ নয়।
মিরা মানি-এর ইনভেস্টমেন্ট রিসার্চ অ্যানালিস্ট রোহান গোয়াল বলেছেন, “সবচেয়ে খারাপ পদক্ষেপ হল খারাপ সময়ে এসআইপি থেকে টানা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।”
বিনিয়োগকারীদের এই বিষয়টি বুঝতে হবে: যখন বাজার নিম্নমুখী থাকে, তখন আপনার এসআইপি আপনাকে একই পরিমাণ টাকায় মিউচুয়াল ফান্ডের আরও বেশি ইউনিট কিনতে সাহায্য করে। “কম দামে বেশি ইউনিট কেনার অর্থ হল, বাজার যখন পুনরুদ্ধার হবে, তখন আপনার লাভ আরও বেশি হবে।” গোয়াল ব্যাখ্যা করেন এবং যোগ করেন যে, আপনার এসআইপি বন্ধ করার অর্থ হল আপনি “বিক্রয় মূল্যে” কেনার সুযোগটি হারাচ্ছেন।
ট্রাস্টলাইন হোল্ডিংস-এর সিইও এন অরুণাগিরি বলেন, বৃহত্তর বাজারে ধীরে ধীরে মূলধন বিনিয়োগ শুরু করার জন্য এটি একটি উপযুক্ত সময় হতে পারে। প্রতিটি ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কট শেষ পর্যন্ত শেয়ার কেনার একটি আকর্ষণীয় সুযোগে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর স্মল ও মিড-ক্যাপ সেগমেন্টে।















