আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের উপচে পড়া আবর্জনার পাহাড় খুব শিগগিরই দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত হতে পারে। কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (CEEW)-এর নতুন একটি সমীক্ষা বলছে, ভারতের শহরাঞ্চলে প্রতিদিন জমা হওয়া জৈব বর্জ্য— অর্থাৎ রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, সবজি-ফলের অংশ, ফুল, মাংসের বর্জ্য ও বাগানের জৈব আবর্জনা— ২০৪৭ সালের মধ্যে প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করতে পারে।
তবে এই রিপোর্ট শুধু আবর্জনা নিয়ে নয়। এটি কর্মসংস্থান, পরিষ্কার বাতাস, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু লক্ষ্য, শহর পরিচালনা এবং ভারতের শহরগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও। সমীক্ষা অনুযায়ী, জৈব বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে আগামী দুই দশকে প্রায় ২৬ লক্ষ সরাসরি চাকরি তৈরি হতে পারে, ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এই রিপোর্ট এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারতের শহরগুলো এমন গতিতে বর্জ্য তৈরি করছে, যা সামাল দিতে বহু পুরসভা হিমশিম খাচ্ছে। আর সেই পরিসংখ্যান সত্যিই উদ্বেগজনক। বর্তমানে ভারত প্রতিদিন প্রায় ১.৭১ লক্ষ টন পৌর কঠিন বর্জ্য (Municipal Solid Waste) তৈরি করে। এর প্রায় অর্ধেকই জৈব বর্জ্য। অথচ CEEW-এর রিপোর্ট বলছে, মোট বর্জ্যের মাত্র ৬১ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়। বাকি বিপুল পরিমাণ বর্জ্য গিয়ে পড়ে উপচে পড়া ডাম্পিং গ্রাউন্ড, অবৈধ ফেলার জায়গা কিংবা নর্দমায়। অনেক ক্ষেত্রেই তা খোলা জায়গায় পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা শহরাঞ্চলের জন্য ভয়াবহ সমস্যা।
CEEW জানিয়েছে, শহরে খোলা জায়গায় আবর্জনা পোড়ানো PM2.5 দূষণের প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী। পাশাপাশি অপরিচালিত জৈব বর্জ্য থেকে নির্গত হয় মিথেন গ্যাস, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। রিপোর্টের হিসাব বলছে, ভারতের বর্জ্য খাত থেকে নির্গমন ১৯৯৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ২২৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে এটি জাতীয় দূষণের সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া উৎসগুলির একটি হয়ে উঠেছে।
আর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের শহুরে জৈব বর্জ্যের পরিমাণ বছরে ২০৮ মিলিয়ন টনে পৌঁছবে। তবে CEEW-এর মতে, এই সংকটকেই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। রিপোর্টে ভারতের জৈব বর্জ্য খাতের জন্য তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মডেল তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমটি ‘বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল’ বা বর্তমান ধারা বজায় থাকার পরিস্থিতি। এতে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ ধীরে ধীরে বাড়বে ঠিকই, কিন্তু ২০৪৭ সালের মধ্যে বর্জ্য খাতের নির্গমন প্রায় ১২০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য পৌঁছে যেতে পারে।
অন্যদিকে, ‘অ্যাক্সেলারেটেড পলিসি সিনারিও’ বা দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হলে শহুরে জৈব বর্জ্যের প্রায় পুরোটা সংগ্রহ করে তার ৯৫ শতাংশ কম্পোস্টিং ও বায়োমিথেনেশন পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। তাহলে দূষণের ছবিটাই বদলে যেতে পারে। দূষণের উৎস হওয়ার বদলে এই খাত প্রায় ৬৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন কমাতে সাহায্য করতে পারে। আরও আগ্রাসী পরিকল্পনায় ছবি আরও বড়। যদি ভারত শহুরে জৈব বর্জ্যের ১০০ শতাংশ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করতে পারে এবং বায়োমিথেনেশন ও বায়ো-CNG উৎপাদন আরও বাড়ায়, তবে বাজারের সম্ভাবনা বেড়ে ৬২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
এই পথ অনুসরণ করলে ১০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি কার্বন নির্গমন অফসেট করা সম্ভব বলে দাবি রিপোর্টের। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ধারণা— ‘বর্জ্য থেকে জ্বালানি’ (Waste to Fuel)। জৈব বর্জ্য থেকে তৈরি হতে পারে কম্পোস্ট, বায়োগ্যাস এবং বায়োমিথেন। আর পরিশোধিত ও সংকুচিত বায়োমিথেনই হয়ে ওঠে বায়ো-CNG, যা জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পরিবহণ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।
রিপোর্ট বলছে, নীতিগত সমর্থন বাড়লেও ভারতের বায়ো-CNG সম্ভাবনা এখনও প্রায় অনাবিষ্কৃত। বর্তমানে দেশের জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের ৯৬ শতাংশই কম্পোস্টিং, আর বায়োমিথেনেশন মাত্র ৪ শতাংশ। CEEW-এর মতে, এই ভারসাম্য বদলানো প্রয়োজন। কারণ বায়োমিথেনেশন শুধু ল্যান্ডফিল থেকে মিথেন নির্গমন কমায় না, জ্বালানি নিরাপত্তাও বাড়ায় এবং ভারতের নেট-জিরো লক্ষ্যে সাহায্য করতে পারে।
রিপোর্ট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে— বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় হিসেবে নয়, পরিষ্কার বাতাসের অবকাঠামো হিসেবেও দেখতে হবে। CEEW-এর ফেলো প্রার্থনা বরা বলেন, “বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আসলে পরিষ্কার বাতাসের অবকাঠামো।” তাঁর সতর্কবার্তা, অপরিচালিত বর্জ্য শুধু শীতকালের দূষণ নয়, সারা বছর জুড়েই দূষণের উৎস হয়ে থাকে।
রিপোর্টে বিশেষভাবে হাইপারলোকাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে— বিশেষত হোটেল, রেস্তরাঁ, বাজার ও বড় আবাসনের মতো বৃহৎ বর্জ্য উৎপাদকদের ক্ষেত্রে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। সমীক্ষা বলছে, প্রতিদিন ১০০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বায়োমিথেনেশন প্ল্যান্টে প্রায় ৩১ জন কর্মী প্রয়োজন হয়— যার মধ্যে থাকেন প্রযুক্তিবিদ, অপারেটর, রসায়নবিদ, লজিস্টিক কর্মী ও অদক্ষ শ্রমিক।
একই মাপের কম্পোস্টিং প্ল্যান্টে কাজ করেন প্রায় ২৮ জন। অ্যাক্সেলারেটেড পলিসি পরিস্থিতিতে এই খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান বর্তমান ৪ লক্ষ থেকে বেড়ে ২০৪৭ সালের মধ্যে ২৬ লক্ষে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহণ, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি উৎপাদন ও সার বিপণন— সব মিলিয়ে তৈরি হতে পারে এক বিশাল ‘গ্রিন ওয়ার্কফোর্স’।
রিপোর্টে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রুলস ২০২৬, যা চলতি বছরের এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে, তাতে উৎসস্থলেই বর্জ্য আলাদা করার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ভেজা বর্জ্য নিকটতম কম্পোস্টিং বা বায়োমিথেনেশন কেন্দ্রে প্রক্রিয়াজাত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। CEEW জানিয়েছে, ভারতের জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যেই প্রায় ১৬টি মন্ত্রক ও সরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— স্বচ্ছ ভারত মিশন-আরবান, GOBARdhan, SATAT, ন্যাশনাল বায়োএনার্জি প্রোগ্রাম এবং ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্প।
তবে গবেষকদের মতে, মূল সমস্যা সমন্বয় ও বাস্তবায়নে। শহরগুলো এখনও ভুগছে দুর্বল বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা, অবিশ্বস্ত তথ্যভাণ্ডার, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থা, অনিয়মিত সংগ্রহ এবং কম্পোস্ট ও বায়ো-CNG-এর সীমিত বাজারের সমস্যায়। রিপোর্ট বলছে, অনেক পুরসভাই ঠিকাদারদের পুরস্কৃত করে কতটা বর্জ্য তোলা হল তার ভিত্তিতে— কতটা আলাদা করা বা পুনরুদ্ধার করা হল, তার ভিত্তিতে নয়। ফলে মিশ্র বর্জ্য এখনও ডাম্পিং গ্রাউন্ডে গিয়ে জমছে।
এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে CEEW পাঁচটি বড় পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে—
উৎসস্থলে বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা জোরদার করা
নিয়মিত বর্জ্য তথ্য আপডেট করা
খরচভিত্তিক নয়, কর্মক্ষমতাভিত্তিক চুক্তি করা
কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো
কম্পোস্ট ও বায়ো-CNG-এর নির্ভরযোগ্য বাজার তৈরি করা
CEEW-এর বক্তব্য স্পষ্ট— ভারতের আবর্জনার পাহাড় শুধুই পরিবেশগত সংকট নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতির মাধ্যমে এটিই হতে পারে কোটি কোটি ডলারের অর্থনীতি, লক্ষ লক্ষ চাকরি এবং পরিচ্ছন্ন শহর গড়ার নতুন পথ।















