আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারত ও আমেরিকা শনিবার উভয়ের জন্য লাভজনক বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির জন্য একটি কাঠামো ঘোষণা করেছে। ভারতের তরফ থেকে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপ ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (বিটিএ) আলোচনার প্রতি তাদের অঙ্গীকার। এই অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির ফলে, ভারতীয় পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক ১৮ শতাংশে নেমে আসবে। এই চুক্তির অংশ হিসেবে, আমেরিকা ভারতীয় আমদানির উপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
শীর্ষ মার্কিন বাণিজ্য আলোচক জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই চুক্তি মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি আমেরিকান শ্রমিক ও উৎপাদকদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। এর ফলে সমস্ত মার্কিন শিল্পপণ্য ও বিস্তৃত পরিসরের কৃষি পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস পাচ্ছে।” আমেরিকার সঙ্গে ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য অর্জনে নেতৃত্ব ও প্রতিশ্রুতির জন্য ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রী পীযুষ গোয়ালকে ধন্যবাদ জানিয়ে জেমিসন।
গোয়েল দাবি করেছেন, এই পদক্ষেপ ভারতীয় রপ্তানিকারক, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষক এবং জেলেদের জন্য ৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বাজার খুলে দেবে। তিনি তাঁর এক্স পোস্টে দাবি করেছেন, রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে আমাদের নারী ও তরুণদের জন্য লক্ষ লক্ষ নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শনিবার ভারত-মার্কিন অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি এই চুক্তিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করা, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।
এক্স-এ একটি পোস্টে মোদি লিখেছেন, “ভারত ও আমেরিকার জন্য এটি একটি দারুণ খবর! আমরা একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির জন্য একটি কাঠামোতে রাজি হয়েছি। দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপনে ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির জন্য আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাই। এই কাঠামো আমাদের সম্পর্কের গভীরতা, বিশ্বাস এবং গতিশীলতাকে প্রতিফলিত করে। এটি ভারতের পরিশ্রমী কৃষক, উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, স্টার্টআপ উদ্ভাবক, জেলে এবং আরও অনেকের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে শক্তিশালী করবে।” তিনি আরও লিখেছেন, “এটি নারী ও তরুণদের জন্য অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। ভারত এবং আমেরিকার উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই কাঠামো দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বকে আরও জোরালো করবে। এই কাঠামো স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খলকেও শক্তিশালী করবে এবং বিশ্বের বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।”
কী কী মূল বিষয় রয়েছে প্রস্তাবিত কাঠামোয়-
শুল্ক এবং বাজারে প্রবেশাধিকার
- ভারত মার্কিন শিল্প পণ্য এবং ডিস্টিলার্স ড্রাইড গ্রেইনস (ডিডিজি), পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত লাল জোয়ার, বাদাম, ফল, সয়াবিন তেল, ওয়াইন ও স্পিরিট-সহ বেশ কয়েকটি কৃষি পণ্যের উপর শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার করবে।
- আমেরিকা বস্ত্র, চামড়া, জুতো, প্লাস্টিক, রাবার, জৈব রাসায়নিক পদার্থ, গৃহসজ্জার সামগ্রী, হস্তশিল্প এবং কিছু যন্ত্রপাতির মতো নির্দিষ্ট ভারতীয় পণ্যের উপর ১৮ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করবে।
- চুক্তি সম্পন্ন হলে আমেরিকা জেনেরিক ওষুধ, রত্ন ও হিরে এবং বিমানের যন্ত্রাংশ-সহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
কোন ক্ষেত্র ছাড় পাবে
- আমেরিকা জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে আরোপিত নির্দিষ্ট ভারতীয় বিমান এবং বিমানের যন্ত্রাংশের উপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করবে।
- ভারত মার্কিন বাজারে স্বয়ংচালিত যন্ত্রাংশের জন্য একটি অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক কোটা পাবে।
- আমেরিকার একটি তদন্তের উপর নির্ভর করে জেনেরিক ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদানগুলির বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে ফলাফল নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য বিধি ও প্রতিবন্ধকতা
- উভয় পক্ষ আগ্রহের ক্ষেত্রগুলিতে একে অপরকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজারে প্রবেশের সুবিধা দেবে।
- পণ্যের উৎস সংক্রান্ত নিয়মা নিশ্চিত করবে যে লাভ যেন ভারত আমেরিকাই পাবে।
- ভারত মার্কিন চিকিৎসা সরঞ্জাম, আইসিটি পণ্য আমদানির পদ্ধতি এবং কৃষি পণ্য সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের উদ্বেগের সমাধান করবে।
- ব্যবসায়িক সম্মতি প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য মান এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করবে দুই দেশ।
ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি
- যদি কোনও দেশ শুল্ক পরিবর্তন করে, তবে অন্য দেশ তাঁর প্রতিশ্রুতিতে পরিবর্তন আনতে পারবে।
- বৃহত্তর বিটিএ-এর অধীনে বাজার ব্যবহারের সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
- ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক কমানোর জন্য ভারতের অনুরোধটি আমেরিকার বিবেচনা করবে।
বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রযুক্তি
- উভয় দেশই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নীতিকে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করবে। বিনিয়োগ ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।
- ভারত আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকা থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি, বিমান, মূল্যবান ধাতু, প্রযুক্তি পণ্য এবং কোকিং কয়লা কেনার পরিকল্পনা করেছে।
- জিপিইউ এবং ডেটা-সেন্টারের সরঞ্জাম-সহ প্রযুক্তি পণ্যের বাণিজ্য যৌথভাবে প্রসারিত করা হবে।
