আজকাল ওয়েবডেস্ক: ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা নতুন নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা ও জনসভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জি একাধিকবার দাবি করেছেন, ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা এলাকায় প্রায় ১০০ শতাংশ উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে সেই দাবির বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ অন্যরকম। ফের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ডায়মন্ড হারবার ২ নম্বর ব্লকের সরিষা আশ্রম মোড় থেকে কাঁটাপুকুরিয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ককে কেন্দ্র করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি হলেই প্রায় এক হাঁটু জল জমে যায় এই রাস্তায়। দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় থাকে না এটি রাস্তা, নাকি বড় কোনও পুকুর। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এলাকার মানুষকে। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন প্রায় ১০ থেকে ১৫টি গ্রামের কয়েক লক্ষ বাসিন্দা। স্কুলের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, রোগী, ব্যবসায়ী, কৃষক, নিত্যযাত্রী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চালকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায় বর্ষাকালে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রতিবছর বর্ষার আগে রাস্তা সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হয়। পঞ্চায়েত ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার অভিযোগ জানানো হলেও স্থায়ী কোনও সমাধান হয়নি। বরং প্রতিবছর রাস্তা সংস্কারের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয় এবং প্রকল্পের ফলক বসানো হয়। সেই ফলকে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির নামও থাকে। কিন্তু বাস্তবে রাস্তার অবস্থা বছরের পর বছর একই থেকে গিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় চিকিৎসক ডা. অনুপম প্রামাণিক বলেন, "দীর্ঘদিন ধরেই আমরা এই সমস্যার মধ্যে রয়েছি। এলাকার নিকাশি নালা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। বৃষ্টির জল বের হওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। ফলে একবার জল জমলে প্রায় এক মাস পর্যন্ত সেই জল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। বহু বছর ধরে খাল সংস্কারও হয়নি। স্কুলের ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের অনেক সময় কোলে করে রাস্তা পার করাতে হয়। রোগীদেরও আমার চেম্বারে আসতে চরম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। মাঝে মাঝে কিছু ইট ফেলে কাজের নামে দায়িত্ব পালন করা হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।"
এই পরিস্থিতির মধ্যেই এলাকায় নিকাশি নালা পরিষ্কার ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ডায়মন্ড হারবার ২ নম্বর বিজেপি মণ্ডল। মণ্ডল সভাপতি উত্তম বাগের নেতৃত্বে ব্লক প্রশাসনের উপস্থিতিতে নিকাশি নালা পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের জলযন্ত্রণার পর এই উদ্যোগে কিছুটা আশার আলো দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিজেপি নেতা উত্তম বাগ বলেন, "গত ১৫ বছর ধরে এই এলাকার মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি শুনেছেন। উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে রাস্তা ও নিকাশি ব্যবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন ১৫টি গ্রামের কয়েক লক্ষ মানুষ যাতায়াত করেন। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। মানুষের দুর্ভোগের কথা ভেবেই আমরা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিকাশি নালা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। স্থায়ীভাবে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা চলছে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, "আগের সরকার শুধু ফলক বসিয়ে উন্নয়নের প্রচার করেছে। সাধারণ মানুষের কথা ভাবেনি। প্রতি বছর একই সমস্যা তৈরি হয়েছে, কিন্তু কোনও স্থায়ী পদক্ষেপ করা হয়নি।"
স্থানীয় বাসিন্দা কনকান্তি মণ্ডল বলেন, "সরিষা আশ্রম মোড় এলাকায় গত ১৫ বছর ধরে জল জমে। এর ফলে সরিষা, কলাগাছি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের জীবন কার্যত অচল হয়ে যায়। এবার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। এলাকার সকল মানুষ ও ব্যবসায়ীদেরও এই কাজে সহযোগিতা করা উচিত।"
আর এক বাসিন্দা অভিজিৎ পুরকাইত বলেন, "প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগ। জল জমে থাকার কারণে অনেক সময় পরিবার নিয়ে অন্যত্র থাকতে বাধ্য হই। এত বছরেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এবার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সফল হোক এবং স্থায়ীভাবে এই সমস্যার সমাধান হোক- এটাই আমাদের একমাত্র দাবি।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু রাস্তা নয়, নিকাশি নালাগুলিও বছরের পর বছর পরিষ্কার বা সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে বৃষ্টির জল দ্রুত বেরোতে পারে না। ফলে গোটা এলাকা দীর্ঘদিন জলমগ্ন হয়ে থাকে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন জনজীবনের ওপর।
এলাকাবাসীর দাবি, অস্থায়ী মেরামত বা নামমাত্র সংস্কার নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় রাস্তা ও নিকাশি ব্যবস্থার স্থায়ী উন্নয়ন। তাহলেই বহু বছরের এই জলযন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে।
















