আজকাল ওয়েবডেস্ক: ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধন বোধ হয় একেই বলে। কান্দির ঐতিহ্যবাহী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ ওরফে লালাবুর রথযাত্রা শুধু একটি উৎসব নয়, কান্দিবাসীর আবেগ। রাজার হাত ধরে শুরু হওয়া এই উৎসব আজ জনতার উৎসব। এবার সরকারি অনুদান আর মানুষের ভক্তি মিলে এই  রথযাত্রা আরও বর্ণময় হতে চলেছে। আর এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করেই এখন গোটা কান্দি শহর জুড়ে উৎসবের আবহ। 

আড়াইশো বছরের পুরনো এই রথযাত্রাকে ঘিরে আট দিন ধরে মেতে ওঠে গোটা শহর। রাজবাড়ি চত্বরে বসে মহোৎসবের মেলা। চলে গীতা পাঠ, পূজা-অর্চনা, হরিনাম সংকীর্তন। 

কান্দি রাধাবল্লভ জিউ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত প্রশান্ত অধিকারী বলেন, "রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ ওরফে লালাবাবু পুরী থেকে ফিরে এসে প্রায় ২৫০ বছর আগে এই রথযাত্রার প্রচলন করেছিলেন।" 

সময়ের সঙ্গে অনেক নিয়ম-নীতির বদল হলেও আজও রথের দিন নির্দিষ্ট সময়ে মেনে রাজবাড়ি থেকে রথ বের হয়। সমগ্র কান্দি পরিক্রমা করে সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসে রাজবাড়িতে। 

প্রশান্তবাবু আরও বলেন, "প্রথা মেনে রথ মাসির বাড়ি যাওয়ার কথা । কিন্তু রাজবাড়ি থেকে অনতিদূরে অবস্থিত আসল মাসির বাড়ির ভগ্নদশার কারণে রাজবাড়িরই অন্য একটি ঘরকে প্রতীকী মাসির বাড়ি হিসেবে রাখা হয়। সেখানেই আট দিন বিরাজ করেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।"

তার কথায় , "শুধু কান্দি শহর নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী রথের দিন রথের দড়ি ছুঁতে এবং মহাপ্রভুর আশীর্বাদ নিতে এখানে আসেন। আট দিন ধরে রাজবাড়ি চত্বরে দিন-রাত গীতা পাঠ চলে। পাশাপাশি বসে বিশাল মেলা।"


কান্দির বাসিন্দা কাঞ্চন দাস বলেন, "আমাদের কান্দি শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব হল এই রথযাত্রা। এই উৎসবের জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি। একদিন নয়, টানা আট দিন ধরে এই উৎসবে সামিল হয় কান্দিবাসী। আজও আমাদের কাছে  রাধাবল্লভ জিউ মন্দিরের রথযাত্রা একটি আবেগ।"

কান্দি রাধাবল্লভ জিউ মন্দিরের এই রথযাত্রা একসময় রাজবাড়ির পারিবারিক উৎসব হলেও, বর্তমানে এটি একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রথযাত্রা কমিটির সম্পাদক গৌরাঙ্গ চন্দ্র বলেন, "এখানকার রথে শ্রী জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ নিয়ে রথ সারা শহর পরিক্রমা করে। হাজার হাজার ভক্তের উপস্থিতিতে আবার সেই রথ ফিরে আসে রাজবাড়ি চত্বরে।"

তবে এবারের রথযাত্রায় বড় চমক রাজ্য সরকারের অনুদান। প্রসঙ্গত, রাজ্যে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের ৬০টি রথযাত্রা কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান দিয়েছেন। সেই তালিকায় রয়েছে কান্দি রাজবাড়ির রাধাবল্লভ জিউ মন্দিরের রথযাত্রা কমিটিও।

এই খবরে আনন্দে মাতোয়ারা  কমিটির সদস্যরা। রথযাত্রা কমিটির সহকারি সম্পাদক গৌরাঙ্গ গোপাল সাহা বলেন, "এই বছর আমরা আরও ভালোভাবে রথযাত্রার আয়োজন করতে পারব এই অনুদানের টাকা দিয়ে।"

তিনি জানান, "এবার তিনটি রথেরই কাঠামোয় বদল আনা হচ্ছে। শোভাযাত্রায় প্রতি বছর ৪০টি হরিনাম দল থাকলে, এবার তার দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাদ্যকর দলের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। আগে শুধু স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও, এবার বহিরাগত শিল্পীদেরও আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।"

খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনেও থাকছে নতুনত্ব। প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য অন্ন মহোৎসবের ব্যবস্থা হয়। এবার তাতে মিষ্টি, দই, বোঁদে, পায়েস যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গৌরাঙ্গবাবু আরও বলেন, "কান্দিবাসীর তরফ থেকে রাজ্য সরকারের কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সোজা রথের দিন না হলেও, উল্টো রথের দিন রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী ও কান্দির বিজেপি বিধায়ক গার্গী দাস ঘোষ উৎসবে উপস্থিত থাকবেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।"