আজকাল ওয়েবডেস্ক: যে জল্পনা এতদিন ধরে তৈরি হয়েছিল, তা এবার একদম সত্যি হতে চলেছে। রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল রদবদল বা ওলটপালটের ইঙ্গিত এখন স্পষ্ট। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সাড়ে ১০টা। বিধানসভায় একে একে ঢুকতে শুরু করেছেন তৃণমূল বিধায়করা। তবে সবার নজর কেড়ে সকাল সকালই সেখানে হাজির হয়েছেন সদ্য তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি। তাঁর পরপরই বিধানসভায় প্রবেশ করেন চাঁচোলের বিধায়ক প্রসূন ব্যানার্জি, বোলপুরের চন্দ্রনাথ সিনহা, গোলাম রব্বানী এবং সাবিনা ইয়াসমিনের মতো প্রবীণ ও পরিচিত মুখেরা। দল ভাঙার এই উত্তেজনার পারদ কতটা চড়েছে, তা চন্দ্রনাথ সিনহার একটি মন্তব্যেই পরিষ্কার। বিধানসভায় ঢোকার মুখে তাঁকে যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন যে ‘বিরোধী দলনেতা কে?’ তিনি একগাল হেসে উত্তর দেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই তা জানতে পারবেন’। অন্যদিকে সাবিনা ইয়াসমিন সরাসরি বলে বসেন, ‘বিরোধী দলনেতা বাছতে এসেছি’।
নির্বাচনের আগে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি বাংলার মানুষকে বলেছিলেন, ২৯৪টি কেন্দ্রের প্রার্থী আসলে তিনিই নিজে। কিন্তু ভোটের ফলাফল বেরোনোর পর পরিস্থিতি যেভাবে ঘুরে গেছে, তাতে অনেকেই মনে করছেন মমতার হাত থেকে বোধহয় তৃণমূলের রাশ আলগা হতে শুরু করেছে। ঋতব্রত ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে খবর, প্রায় ৬০ জন বিধায়কের সই বা সম্মতি নিয়ে আজ আলাদা একটি চিঠি জমা পড়তে চলেছে। গতকাল বিধানসভার স্পিকার উপস্থিত ছিলেন না, তবে আজ তিনি আসবেন। আর স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুর পা রাখামাত্রই যে রাজ্য রাজনীতিতে এক বড়সড় বিস্ফোরণ ঘটতে চলেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলায় ভোটের ভরাডুবির পর মমতা ব্যানার্জি বারবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, মহারাষ্ট্রে বিজেপি যেভাবে শিবসেনা বা এনসিপি ভেঙে সরকার গড়েছিল, ঠিক একই কায়দায় বাংলাতেও দল ভাঙানোর খেলা হতে পারে। আজ বিধানসভার অন্দরের চিত্রটা সেই আশঙ্কার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশকে সঙ্গে নিয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জি ‘আসল তৃণমূল’ নামে নতুন দল খুলতে পারেন, এমন গুঞ্জন এখন তুঙ্গে। এই আগুনের মাঝেই ঘি ঢেলেছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়ের একটি ফেসবুক পোস্ট। তিনি তাঁর প্রোফাইলে স্পষ্ট লিখেছেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতন অবস্থা হলো তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকারের কাছে প্রায় ৫০ জন টিএমসির বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গেছে ঋতব্রত। খেলা হবে।’
তৃণমূলের এই বেনজির সংকটের সূত্রপাত মূলত বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। অভিষেক ব্যানার্জির নামাঙ্কিত একটি রেজিলিউশন বা চিঠির ভিত্তিতে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, দলের বিধায়করা সর্বসম্মতিক্রমে বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এর পরেই শুরু হয় আসল নাটক। দলের ভেতরেই কানাঘুষো শুরু হয়, ওই রেজিলিউশনে অনেক বিধায়কের সই নাকি আসলে জাল! পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নেয় যে, সইয়ের সত্যতা যাচাই করতে স্বয়ং সিআইডি-কে আসরে নামতে হয়েছে। একাধিক বিধায়কের বাড়ির পাশাপাশি সিআইডি হানা দিয়েছে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতেও। রাজ্য জুড়ে জাল-সই কাণ্ডের তদন্তে ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ গঠন করা হয়েছে।
এই ডামাডোলের মধ্যে তৃণমূলের অন্দরে ‘আমরা-ওরা’ বিভাজনটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। দলের মোট ৮০ জন জয়ী বিধায়কের মধ্যে একটা বড় অংশই শীর্ষ নেতৃত্বের চাপিয়ে দেওয়া এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না। গত রবিবার মমতার ডাকা জরুরি বৈঠকে ৮০ জনের মধ্যে হাজির হয়েছিলেন মাত্র ২০ জন বিধায়ক, যা দলের ভেতরের গভীর ফাটলকেই প্রমাণ করে। অন্যদিকে পরাজিত বহু নেতাই এখন দলের সেনাপতি অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। আঙুল উঠছে ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে। দলেরই একাংশের মতে, অভিষেক যেদিন থেকে ‘দাদা’র ভূমিকা ছেড়ে ‘বস’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন, সেদিনই নাকি দলের কফিনে শেষ পেরেকটা পোঁতা হয়ে গিয়েছিল।
গত কয়েক বছর ধরে বাংলার রাজনীতিতে ‘কালীঘাট বনাম ক্যামাকস্ট্রিট’ কিংবা ‘নবীন বনাম প্রবীণ’ দ্বন্দ্বের কথা বারবার শোনা গিয়েছে। এবার সেই অসন্তোষই বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। বিক্ষুব্ধ বিধায়করা এখন কংগ্রেসের পুরনো আমল এবং মানস ভুঁইয়ার বিধানসভার পদ পাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে নেতৃত্বের গায়ে সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছেন। ইতিমধ্যেই প্রায় ৫০ জন বিধায়ক নিজেদের নামের তালিকা গুটিয়ে তৈরি করে ফেলেছেন এবং সূত্রের খবর, তাঁরা সেই চিঠিতে সইও করে দিয়েছেন। এখন শুধু অপেক্ষা বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসুর ঘরে সেই তালিকা জমা পড়ার। ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বে এই ৫০ জন বিধায়কের বিদ্রোহ যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তবে তা বাংলার সংসদীয় রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক অধ্যায় হয়ে থাকবে।















