আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভিন রাজ্যে আবারও বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যমৃত্যু। এবার পুরুলিয়ার এক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হল কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে। মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের নাম, প্রসন্ন কুমার (৩৯)। তিনি ঝালদা দু’নম্বর ব্লকের চেক্যা গ্রাম পঞ্চায়েতের চেক্যাতের বাসিন্দা ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বেঙ্গালুরুতে কাজে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর আর বাড়িতে ফেরার সুযোগ হয়নি তাঁর। অভিযোগ ছিল, ঠিকাদার সংস্থা আটকে রেখেছিল তাঁকে। অতীতে তিন থেকে চারবার লুকিয়ে কর্মস্থল থেকে স্টেশনে পালিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তারপরেও ওই ঠিকাদার সংস্থা তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
পরিবার আরও জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার শেষবার ফোন করেছিলেন তিনি। শুক্রবার রাতে ঘুমের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিবারের অভিযোগ, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। পরিযায়ী শ্রমিককে খুন করা হয়েছে। তাঁর মাথা, ডান হাতের আঙুল, নাকে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
বেঙ্গালুরুতে পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যমৃত্যুর খবর পেয়েই পরিবারের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। ভিন রাজ্য থেকে বাংলার মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ দ্রুত বাড়িতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অভিষেকের উদ্যোগে। আইনি সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছেন অভিষেক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেঙ্গালুরুর সাম্পিগেহাল্লি থানা এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারের কাজ করতেন প্রসন্ন। স্ত্রী এবং দুই ছেলে রয়েছে তাঁর। ঠিক মতো বেতন দেওয়া হত না বলেও অভিযোগ জানিয়েছে তাঁর পরিবার।
চলতি মাসের শুরুতেই এমন আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল মুম্বইয়ে। ভিন রাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের মর্মান্তিক পরিণতি। উত্তর ২৪ পরগনা বসিরহাট মহকুমার স্বরূপনগর থানার বালতি নিত্যানন্দকাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বালতি মাঝের পাড়ার ঘটনা। গত সাত বছর আগে আলফাজ মণ্ডল পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে কাজ করতে গিয়েছিলেন ভিন রাজ্যে।
মুম্বই মেট্রো রেল স্টেশনের জন্য ঠিকাদারের অধীনে কাজ করতেন। থাকতেন মুম্বইয়ের ডাকিয়ার রোড এলাকায় সোমবার্গে। গত ২ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাত আটটা নাগাদ কাজ থেকে ফিরে ট্রেনে করে ডাকিয়া রোডে ফিরছিলেন। তারপর থেকে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।
গতকাল মঙ্গলবার রাত দুটো নাগাদ মুম্বই পুলিশ মুম্বই মসজিদ বন্দর রেললাইন থেকে তাঁর রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করে। এরপর তাঁর পরিবারকে জানানো হয়, নিখোঁজ পরিযায়ী শ্রমিক আলফাজের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। হঠাৎ কী হল? কেনই বা নিখোঁজ হয়ে গেলেন? তারপর রক্তাক্ত মৃতদেহ রেললাইনদের থেকে উদ্ধার হল। ইতিমধ্যে তাঁর মৃত্যু নিয়ে রহস্যের দানা বেঁধেছে।
মৃতের পরিবার জানায়, আলফাজকে বেশ কয়েক দিন ধরেই বাঙালির শ্রমিক বলে, এমনকী বাংলাদেশী বলে ওই ঠিকাদারের অধীনে থাকা কিছু শ্রমিক তাঁকে হেনস্থা করতেন। বাংলা ভাষায় কথা বলা, বাঙালি হওয়ায় এমনকী বাংলাদেশের লোক বলেও তাঁকে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কথা আলফাজ তাঁর ভাই জিন্নাকে ফোনে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। এর কয়েক দিন পরেই এই ঘটনা ঘটল।
পরিবারের তরফে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথেই কি তাঁকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, নাকি তাঁকে পরিকল্পনা করে খুন করে রেললাইনের ধারে ফেলে রাখা হয়েছিল! মৃত আলফাজের ভাই জিন্না আলি ও আত্মীয় শফিকুল গাজীর অভিযোগ, যেভাবে বাঙালিদের ওপরে ভিন রাজ্যে অত্যাচার হচ্ছে, বাংলা ভাষায় কথা বলায় বাংলাদেশী বলে দাগিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তারই বহিঃপ্রকাশ এই ঘটনা হতে পারে।
পরিবারের দাবি, মহারাষ্ট্র পুলিশ উপযুক্ত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিক। ভিন রাজ্যের শ্রমিকরা এই রাজ্যে এসে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তখন তো তাঁরা বাংলায় আক্রান্ত হন না। শুধুমাত্র বাঙালিরা ভিন্ন রাজ্যে গিয়ে আক্রান্ত হবেন, কেন এটা হবে? মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছেও তাঁদের আবেদন, এই মৃত্যুর প্রকৃত তদন্ত করা হোক।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সিপিআইএম কমিটির সদস্য রাজু আহমেদ বলেন, 'ভিন রাজ্যে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। কোথাও বাঙালি আক্রান্ত হচ্ছে, কোথাও হত্যা করা হচ্ছে। সঠিক তদন্ত দরকার।'
