আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলায় এখন গোষ্ঠী বদলের মরশুম। নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেস যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম, ঠিক সেই সময়েই দলের লোকসভা সাংসদ মহুয়া মৈত্র রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কট্টর মমতা-পন্থী হিসাবে পরিচিত কষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, রাজনৈতিক পথ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর এক "আবেগঘন সম্পর্ক" রয়েছে।
তৃণমূলের সংসদীয় দলে মমতার অনুগতদের সংখ্যা যখন ক্রমশ কমছে। ঠিক তখন মহুয়ার এই মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা উস্কে দিয়েছে। ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বিধায়কদের গোষ্ঠীর সঙ্গে তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে মমতা এখন ব্যস্ত। এর পাশাপাশি সংসদেও তৃণমূল বড় ধাক্কা খেয়েছে। দলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ শাসক দল বিজেপিকে সমর্থন করার কথাজানিয়ে অপেক্ষাকৃত অপরিচিত 'ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া' (এনসিপিআই)-র সঙ্গে মিশে গিয়েছেন।
"শুভেন্দু আমাকে অনেক সহায়তা করেছিলেন"
সাক্ষাৎকারের এই অংশটি 'এক্স'-এ শেয়ার করেছেন মহুয়া মৈত্র। তিনি বলেছেন, "ব্যক্তিগত স্তরে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ভাল। আমরা যখন একসঙ্গে তৃণমূলে ছিলাম, তখন তিনি আমাকে অনেক সমর্থন করেছিলেন।" এরপর তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক কঠিন সময়ে শুভেন্দুর সমর্থনের কথা স্মরণ করেন। তৃণমূল সাংসদ বলেন, "২০১৪ সালে আমার লোকসভার টিকিট পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমি তা পাইনি। আমি সারা রাত কেঁদেছিলাম। সেই সময় শুভেন্দু আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন।"
তৃণমূলের এই স্পষ্টভাষী নেত্রী করিমপুর থেকে তাঁর নির্বাচনী যাত্রা শুরু করেছিলেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তখন নতুন মুখ মহুয়ার হয়ে দলের কোনও প্রবীণ নেতা প্রচারে আসেননি। তবে তাঁর প্রথম জনসভায় শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি তুলে ধরে মহুয়া মৈত্র বলেছেন, "আমি যখন প্রথম করিমপুর থেকে লড়ি, তখন আমার হয়ে প্রচার করতে কেউ আসেননি। প্রথম জনসভাটি করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। আজও আপনারা ছবিগুলো দেখলে দেখবেন, সেখানে শুধু শুভেন্দু আর আমিই ছিলাম।"
মহুয়া মৈত্র স্বীকার করেন যে, তাঁদের মধ্যে এখন আর নিয়মিত কথা হয় না, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে- ব্যক্তিগত সম্পর্ক দলীয় গণ্ডির ঊর্ধ্বে। তৃণমূল সাংসদ বলেন, "শুভেন্দু আজ অন্য দলে চলে গিয়েছেন, তাই আমাদের আর কথা হয় না। কিন্তু তিনি আমাকে যে সাহায্য করেছিলেন, তা আমি ভুলতে পারব না।"
মমতা ব্যানার্জি তাঁর দলের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। মমতা, মহুয়া মৈত্রকে দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ঠিক সেই সময়েই মহুয়ার শুভেন্দু-বন্দনা কীসের ইঙ্গিত, তা নিয়েই জল্পনা ষশুরু হয়েছে।
মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে মতপার্থক্য এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেকের নেতৃত্বে দলের তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের জেরে ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছাড়েন। পরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছর সামলেছেন বরোধী দলনেতার পদ। এই বছরের বিধানসবা ভোটে বিজেপির ব্যাপক জয়ের পর সেই শুভেন্দুকেই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী করেছে গেরুয়া শিবিরের নেতৃত্ব।
এরপর থেকেই তৃণমূলে ভাঙনের সূত্রপাত। অভিষেক ব্যানার্জির প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দলের ৮০ জন বিধায়কের অধিকাংশ। 'বিদ্রোহী' বিধায়কদের শিবির নিজেদের 'অসল তৃণমূল' বলে দাবি করেছে। মমতার নির্দেশ তুচ্ছ করে বিরোধী দলনেতা হয়েছেন ঋতব্রত ব্য়ানার্জি। অভিষেক ব্যানার্জিকে তৃণমূলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই মমতাকে সরিয়ে তৃণমূলের চেয়ারপারসন হিসেবে অরূপ রায়কে বসানো হয়েছে। এছাড়া 'বিদ্রোহী' শিবির দলের নাম ও প্রতীকের ওপর নিজেদের দাবি জানাতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থও হয়েছে।
বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে পার্থক্য প্রসঙ্গে মহুয়া মৈত্র
এক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যে মহুয়া মৈত্র শুভেন্দুকে ধন্যবাদ জানান তৃণমূলের ‘শুদ্ধিকরণ’-এর জন্য। তিনি দাবি করেন, মমতা যা করতে পারেননি, শুভেন্দু ও বিজেপি তা এক দিনেই করে দেখিয়েছে।
মহুয়া বলেন, "মমতা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখতে পছন্দ করেন। দলের ব্যর্থতা হল যে তারা সব নেতাকেই মানিয়ে নিয়েছে। এমনকি যারা একেবারেই অযোগ্য ও অপ্রয়োজনীয়, তাদেরও। দিদির খতিয়ে দেখা উচিত ছিল যে, এই নেতারা আদৌ নিজেদের ক্ষমতায় নির্বাচনে জিততে পারতেন কি না।"
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জনের সমর্থন তাদের পক্ষে রয়েছে। এমনকি অরূপ বিশ্বাস ও ফিরহাদ হাকিমের মতো প্রবীণ নেতারা (যারা কিছুদিন আগেও মমতার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন) তাঁরাও বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন।
এরপর মহুয়া বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। লোকসভার এই সাংসদ বলেন, "বিজেপির শক্তিশালী ক্যাডার বা কর্মী-ভিত্তি রয়েছে, তারা সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে এবং তাদের একটি স্পষ্ট হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ আছে। দলটি কোনও একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।"
তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের মিশে যাওয়া নিয়ে যে জল্পনা চলছে। সে প্রসঙ্গে মহুয়া বলেন যে, আদর্শগতভাবে তৃণমূল বরাবরই কংগ্রেসের কাছের। তবে তিনি এই দুই দলের মিশে যাওয়ার জল্পনা উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে না। এ ধরনের খবরের কোনও ভিত্তিই নেই।"
যদিও মহুয়ার দলবদলের কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, তবুও শুভেন্দু অধিকারী সম্পর্কে তাঁর প্রশংসা ও ইতিবাচক স্মৃতিচারণ বাংলার উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে।















