গোপাল সাহা: "শেষ হয়েও যেন হলো না শেষ।" বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর) শেষ হয়েও রয়ে গেল অসম্পূর্ণ। ২৮ এ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর সামনে এল ৬০ লক্ষের বিচারাধীন বা এডজুডিকেশন তালিকা। যার মধ্যে ৪৫ শতাংশ ভোটারদের নাম কেটে বাদ গিয়েছে। সংখ্যার নিরিখের বাদ পড়েছে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন ভোটার। আর এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বাদ যাওয়ার তালিকা প্রায় ৯১ লক্ষ। যা নিয়ে রাজ্যে রাজনৈতিক তরজা যেমন তুঙ্গে, তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন কি হবে বাদ পড়াদের ভবিষ্যৎ? যদিও এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, ট্রাইবুনালে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ দেখাতে পারলে অবশ্যই বাদ পড়াদের নাম পুনরুদ্ধার হবে। অর্থাৎ ভোটার তালিকায় নাম যোগ হবে। যদিও এবারের ভোটে তারা অংশগ্রহণ করতে পারবে না, কিন্তু পরবর্তীতে তারা ভোটাধিকার পাবে বলেই জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। 

আর এই বাদ যাওয়া তালিকার নিয়েই সাধারণের মধ্যে যেমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তেমনি বহু মানুষ জেলাশাসকের কার্যালয়ে তাদের আবেদন জমা দিতে উপস্থিত হচ্ছেন। বহু মানুষের অভিযোগ, তারা উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ জমা দিলেও তাদের নাম বাদ চলে গিয়েছে। কারো কারো অভিযোগ স্ত্রী নাম থাকলেও স্বামীর নাম বাদ গিয়েছে, স্বামীর নাম থাকলেও তার স্ত্রী এর নাম বাদ পড়েছে, আবার সন্তানের নাম থাকলেও বাদ পড়েছে তাদের বাবা মার নাম। এমনকি এসব হয়েছে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ দেওয়ার পরেও। অভিযোগ, অনেককেই ভুল বুঝিয়ে বেশ কিছু মানুষ, কখনও আইনজীবী, আবার কখনও আদালতের কর্মী প্রতারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এমনই এক পরিস্থিতির শিকার গৃহবধূ রাধা রাও। এই গৃহবধূ হুগলির কোন্নগরের চার নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, নিজের নাম থাকলেও তাঁর স্বামী রামা রাও এবং রামার দুই ভাই অর্থাৎ তাদের পরিবারে তিনজনের নাম বাদ চলে গিয়েছে। সমস্ত নথি দিতে পারলেও তাঁদের নাম যুক্ত করা হয়নি ভোটার তালিকায়। উপরন্তু, একজন আইনজীবী দু'বার করে নাম ফিরিয়ে দেওয়ার আশা দেখিয়ে তাঁদের থেকে বেশ কিছু টাকাও আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। 
 
ভোটার তালিকায় আদৌ নাম উঠবে কিনা এই ভেবেই রাও পরিবার বর্তমানে যথেষ্ট আতঙ্কে রয়েছে। পরবর্তীতে তাঁদের নাম না উঠলে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ বাদেশে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বহু মানুষ, যাদের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, হারিয়ে ফেলেছেন ভোটাধিকার তারাও একই কারণে ভীত।
 
যদিও নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট বক্তব্য, যোগ্য ভোটারের নাম কোন অবস্থাতেই তালিকা থেকে বাদ যাবে না। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা একেবারেই উল্টো। যা যথেষ্টই উদ্বেগজনক। কী হবে তালিকা থেকে বাদ পড়াদের ভবিষ্যৎ, সেই প্রশ্নই সব সময় মনে উঁকি মারছে।

এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাধা রাও বলেন, "সমস্ত তথ্য নথি নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল, তার পরেও নাম কেটে দিয়েছে। ২০০২ এ নাম ছিল না আমার শ্বশুর শাশুড়ির। তাই জন্য যা যা নথি চেয়েছিল সবটাই দিয়েছিলাম। তারপরও নাম কেটে দিয়েছে। এরপর একজন আইনজীবী শ্রীরামপুর আদালতে নিয়ে যায় নাম তুলে দেবে বলে। দু'বারে ৫০০ টাকা করে নিয়েছেন কিন্তু নাম ওঠেনি। আমাদের সঙ্গে প্রতারণা হল। জানি না নির্বাচন কমিশন আমাদের নাম তুলবে কিনা! খুব চিন্তায় আছি, ভয়ে আছি এরপর কী হবে ভেবে।"

এই বিষয় নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করা হলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল বলেন, "এই বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। আমি কী করব? আমি কী এই ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে এখন ময়দানে নামব? সেখানে পুলিশ আছে, পুলিশকে কমপ্লেন করুক। পুলিশ দেখবে বিষয়টা।"