প্রকাশ মণ্ডল, আলিপুরদুয়ার: রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পর এবার বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে বনদপ্তরের পাতা ট্র্যাপ ক্যামেরায় দেখা মিলল ক্লাউডেড লেপার্ডের। যা দেখে দ্বিগুণ আনন্দিত বক্সা বাঘ বন কর্তৃপক্ষ। 
জানা গেছে ক্লাউডেড লেপার্ড একটি বিরল প্রজাতির বাঘ। ক্লাউডেড লেপার্ডের পশম গাঢ় ধূসর বা গেরুয়া রঙের হয়। যা প্রায়শই কালো এবং গাঢ় ধূসর রঙের দাগের মধ্যে ঢাকা থাকে। মাথায় কালো দাগ থাকে এবং তাঁর কানও কালো থাকে। চোখের কোণ থেকে গালের উপর, মুখের কোণ থেকে ঘাড় পর্যন্ত এবং ঘাড় বরাবর কাঁধ পর্যন্ত আংশিকভাবে মিশে যাওয়া ডোরাকাটা দাগ থাকে।

ক্লাউডেড লেপার্ড সাধারণত নেপাল, ভুটান এবং ভারতের হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মায়ানমার, দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়া এবং চীনের ইয়াংজি নদীর দক্ষিণে পাওয়া যায়। ভারতে এটি সিকিম, উত্তরবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, অসম, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যে উপ-ক্রান্তীয় বনাঞ্চলে দেখা যায়।

জানা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সিকিমের খাংচেন্ডজোঙ্গা বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভে শেষবার ক্লাউডেড লেপার্ড দেখা গিয়েছিল। ২০১০ থেকে  ২০১১ সাল পর্যন্ত মানস জাতীয় উদ্যানে শুমারির সময় ১৬টি ক্লাউডেড লেপার্ড রেকর্ড করা হয়েছিল। বনকর্মীদের অনুমান, ভুটান থেকেই এই ক্লাউডেড লেপার্ডটি বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে এসেছে। 

বুধবার বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে ট্র্যাপ ক্যামেরায় ক্লাউডেড লেপার্ডের উপস্থিতি ধরা পড়ার কথা জানালেন বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পশ্চিম বিভাগের উপক্ষেত্র আধিকারিক হরিকিষণ পিজে। তিনি জানান, 'সম্প্রতি বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে বাঘ সুমারি চালু করা হয়েছে। সেই কারণে জঙ্গলে ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হয়। কয়েকদিন আগে সেই ক্যামেরাতে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবি ধরা পড়েছিল। এবার সেই ক্যামেরাতে ক্লাউডের লেপার্ডের ছবি ধরা পড়ে। আমরা আশাবাদী বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে আরও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির প্রমাণ মিলবে।' 

রবিবার ১৯ জানুয়ারি থেকে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে বাঘ সুমারির কাজ শুরু করেন বনদপ্তর-এর কর্মীরা। বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, গোটা ভারত জুড়ে বিভিন্ন জঙ্গলে প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর এই সুমারি হয়। গত ২০২১-২২ সালে সর্বশেষ বাঘ সুমারি হয়েছিল। চার বছর পর ফের জঙ্গলে বাঘেদের সংখ্যা গণনা করতে আবার সুমারি শুরু করা হল। 

ছয় দিন ধরে এই সুমারি চলবে। এই কাজে ২০০ জন বনকর্মীকে নিয়োগ করা হয়েছে। বনকর্মীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলের ৮০টি জায়গায় সুমারির কাজ চালাবেন। ইতিমধ্যে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে ২৫০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা বসিয়েছে বনদপ্তর। ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবি বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা গণনা করা হবে। 

পশ্চিমবঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার সুন্দরবন ও উত্তরবঙ্গে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বাসস্থান আছে। ১৯৮৩ সালে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলকে ১৫তম বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই সময় থেকে বক্সা'র জঙ্গলে বাঘ সংরক্ষণের কাজ চলতে থাকে। ১৯৯৭ সালে এই জঙ্গলকে ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একাধিকবার বক্সার জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি ট্র্যাপ ক্যামেরায় বাঘের দর্শন পাওয়া যায়। যা ঘিরে উচ্ছ্বসিত বন কর্তারা।

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের উপক্ষেত্র আধিকারিক ভাস্কর শর্মা জানান, '২০২১ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষবার বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছিল। জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতি সুনিশ্চিত করতে আমরা ট্র্যাপ ক্যামেরা বসিয়েছিলাম। দুই বছর পর সেই ক্যামেরাতেই তার উপস্থিতি ধরা পড়ে। আমার আশাবাদী জঙ্গলে আরও বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ আমরা পাব।'