সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: "তিন নম্বরে মুড়ো-ভাত, ছয় নম্বরে নিরামিষ, সাতে রুই-কালিয়া...."
অনর্গল এক সুরে পাগলা দাশুর নামতা পড়ার মতো কথাগুলি বলে চলেছে কাঁধে বাঁধিপোতার গামছা আর ইঞ্চিপাড় ধুতি পড়া পরিবেশক.... আর প্রবেশদ্বারের কাছে টেবিলের ওপর ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে --অবিকল তুলসী চক্কোত্তির মতো মানুষটি....দড়িবাঁধা পেন্সিল দিয়ে খাতায় কী সব লিখে চলেছেন।
খুব মনোযোগ সহকারে কিছু লোক খেয়ে চলেছেন --তাড়া হয়তো আছে কিন্তু হুড়োতাড়া নেই.... হাঁকাহাঁকি তো নেই-ই। অতিথিরা মাঝেমাঝে খুব নীচু স্বরে বলছেন -- "ভাত" কিংবা "একটু চাটনি" -- ব্যস, ওই পর্যন্তই!
হঠাৎ পিছনের রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এলো: মুড়োঘন্ট শেষ!
'তুলসী বাবু'ও পৈতেটৈতে সামলে তাড়াতাড়ি উঠে একটা ভিজে কাপড়ের পুঁটলি দিয়ে দরজায় ঝোলানো স্লেটের ওপর লেখা মেনুটি ( আদতে লেখা হতো -- 'আজ পাইবেন') মুছে ঠিক করে দিলেন।
অবশিষ্ট রইলো:
মোচাঘন্ট
রুই - কালিয়া
লাউ চিংড়ি
উচ্ছেচাপড় বাটিচচ্চড়ি
দোকানের বাইরের দেয়ালে ঝুলছে খানিক রঙচটা সাইনবোর্ড
কমলা ভোজনালয়
ভদ্র মহদয়গণের আহারের স্থান
(দুপুরে)
এই ছিল শহর কলকাতার পাইস হোটেল!
কলকাতার সেকালে কালীঘাট ছিল, চিৎপুর ছিল আর এক আনার ছিল বে....শ দাম। শোনা যায় প্রায় দেড়শো বছর আগে, শহরে আসা ব্যবসায়ীদের জন্যই নাকি চিৎপুর অঞ্চলে চালু হয় "পাইস হোটেল"। তখন নাকি সেখানে এক পয়সাতেই দুপুরের খাওয়া মিলতো -- রাজার মাথার ছাপের একটা 'গ্র্যাঞ্জার' ছিল, মশাই।
তারপর, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এগুলি ছড়িয়ে পরে প্রধানত গঙ্গার ঘাটের আশেপাশে, শিয়ালদহ, শোভাবাজার, বাগবাজার, হ্যারিসন রোড, কলুটোলা হয়ে কলেজ পাড়ায়। প্রেসিডেন্সি- মেট্রোপলিটান- স্কটিশ চার্চ কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ - কারমাইকেল (আরজি কর)- ক্যাম্পবেল ( নীলরতন সরকার)... এদের বহু ছাত্র তখন মেসবাড়িতে থেকে পড়াশুনো করত। ক্লাসের মাঝেই তাদের সেরে নিতে হতো দ্বিপ্রাহরিক ভাত -টিফিন। এক আনা দু আনায় স্বাস্থ্যকর, প্রায় ঘরে তৈরি খাবার.... তাও পেটচুক্তি! আর.... সেখানেই রয়ে গেছে পাইস হোটেলগুলির স্বাদু অবদান।
ফিরে দেখলে দেখি বাংলা সাহিত্য এবং সিনেমায় মেসবাড়ি আর পাইস হোটেলের রমরমা উপস্থিতি। বহু প্রখ্যাত সাহিত্যক মায় তাঁদের সৃষ্ট চরিত্ররা পর্যন্ত মেসবাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। ভিয়েন সম্রাট শিবরাম চক্রবর্তী তো আজীবন মেসেই কাটিয়ে গেলেন। আবার মেসবাসী ঘনাদা বা প্রথম যৌবনের ব্যোমকেশকে কি ভোলা যায়? মেস বাড়ির কান্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে হাসির গল্প আর বাংলা সিনেমা। গণিতাচার্য কেশব নাগ মশাইও চাকরি জীবনের শুরুতে থাকতেন মেসে, খেতেন পাইস হোটেলে। শুধু খাওয়াই নয়, ভবানীপুর যদুবাজারের সেই হোটেল মালিককে সহজে হিসাব করা শিখিয়ে ব্যাবসার নিশ্চিত ভরাডুবি থেকে রক্ষা করেছিলেন।
এই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে মেসবাড়ি নিয়ে কচকচির কারণ একটাই, পাইস হোটেলের উত্থানের পিছনে এই মেসবাসী বাঙালিদের একটা বিশেষ অবদান আছে। মেসের দৈনন্দিন জোলো আলুনিমার্কা খাবার খেয়ে গ্রাম বা মফস্বল থেকে আসা মানুষগুলো বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়তেন। সুদুর গ্রামে মা, ঠাকুমা বা স্ত্রীর হাতের রান্নার জন্য এঁদের প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠত। ঠিক এখান থেকেই অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে পাইস হোটেলগুলি। স্বল্প পয়সায় সুস্বাদু এবং নিখাদ বাঙালি রান্নার স্বাদ বাড়ির খাওয়া না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও হয়ত উপশম করত।
পাইস কথাটার উৎপত্তি নিয়েও বিতর্ক আছে। শোনা যায় সস্তা বা কম পয়সার হোটেল থেকে অপভ্রংশে ‘পাইস’ কথাটা আসে। যদিও এর কোন ঐতিহাসিক প্রামাণ্য তথ্য হাজির করতে পারব না। এটা শুধুই অনুমান। ইংরেজ আমলে পয়সা ছিল পাইস, এই মেট্রিক যুগের হিসেবের সঙ্গে মিল নেই। পয়সার পর আনার হিসেব, তাতে দাঁড়াল চার পয়সায় এক আনা, আর ষোল আনায় এক টাকা। কিন্তু সেই যুগে পয়সার দাম ছিল। এক পয়সায় জুটত ভাত ডাল তরকারির পেটচুক্তি খাওয়া। সেই থেকেই হয়তো লোক মুখে পাইস হোটেল কথাটা চালু।
এই ভাবেই পথ চলা শুরু কলকাতার অধিকাংশ পুরনো পাইস হোটেলগুলির।
পাইস হোটেল গুলির কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতো:
১) এক্কেবারে... সকালে বাজার -- দিনে রান্না -- দুপুরে বেলা তিনটে ( কী বড়জোর সাড়ে তিনটে) অবধি খাওয়ার পাট -- বিকেলে বন্ধ।
২) "ফিক্সড মেনু "! আ-লা-কার্ট (A La Carte) খেতে চাইলে --- এখানে আসবেন না।
৩)দেরি করলে খাবার শেষ....সে আপনি যতো নিয়মিত খদ্দের অতিথি হন না কেন।
৪) হোটেলের ভেতর সেলেটে চক-খড়ি দিয়ে এরকম লেখা থাকতো:
পেট চুক্তি /পাই চুক্তি
( যত খুশি খেতে পারেন -- ভাত /ডাল / চাটনি। সব্জি তিনবার মাত্র)।
৫) মুরগির ডিম বা মাংসের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা ছিল গর্হিত-- হেঁসেলে ঢুকতো না ওসব। তাছাড়া ওগুলির ভক্তদের জন্য ছিল কলুটোলা -খিদিরপুরের ঠিকানা।
৬) 'আজকে নগদ, কালকে ধার।'
আর শেষে....
৬) 'ভাত আমার, পেট কিন্তু আপুনার'
পাইস হোটেলের নামে কোনও পালিস থাকত না।
কমলা হোটেল, তরুণ ভোজনাগার, ইয়ং বেঙ্গল হোটেল, আদর্শ হিন্দু হোটেল... বঙ্গলক্ষ্মী ভোজনালয়...।
পাচককূল ছিল অধিকাংশই কলিঙ্গবাসী। এই নিয়ে প্রাক স্বাধীনতা আমলে মোসাহেব সিভিল সার্ভেন্টদের স্যাটায়ার করা হতো।
: কমলা হোটেলে নতুন ICS জয়েন করেছে হে!
( Indian Cooking Service! মনে পড়ে, সুকুমার রায়ের
"ট্যাশগরু" বা "মাসি গো মাসি"?)
খাঁটি বাঙালি (পড়ুন মিষ্টি মিষ্টি 'ঘটি' রান্না), পূর্ব বঙ্গজ (ঝাল আর বর্ণপ্রধান "বাঙাল" পাক) এমনকী চাটগাঁইয়া (মগের মুল্লুকের প্রাত্যহিক খানা) রেসিপিতেও রান্না হতো স্থান-কাল -পাত্র বিশেষে।
অত্যন্ত পরিছন্ন রান্নাঘর ও খাবার জায়গা। কোথাও নীট সিমেন্টের মেঝেতে আসন বা কাঁঠালকাঠের পিঁড়ি, কোথাও বা টেবিল লাগানো বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করা।
অর্ডার দেওয়া, পাত পেড়ে বসা, একের পর এক পদ আসতে থাকা, শেষ পাতে অম্বলের গড়িয়ে (প্রায়) জামাকাপড়ে চলে আসা... মুখ ধুয়ে ঝাঁটার কাঠি (!) দিয়ে খড়কে সেরে তবে হিসেব মেটানো -- পুরোটাই ছিল যেন বনফুলের ছোটগল্পের মতো।
স্বাদু তো বটেই... অনবদ্য।














